খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে মাঘ ১৪৩২ | ২৭ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। দেশটির আইনপ্রণেতারা মনে করছেন, ক্রমবর্ধমান স্ক্রিন টাইম শিশু ও কিশোরদের মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সোমবার রাতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর বিলটি ভোটে তোলা হয়। এতে ১৩০ জন সংসদ সদস্য বিলের পক্ষে ভোট দেন, আর বিপক্ষে ভোট পড়ে ২১টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থনে বিলটি নিম্নকক্ষে পাস হলেও এখনো এটি আইনে পরিণত হওয়ার একটি ধাপ বাকি রয়েছে। ফ্রান্সের উচ্চকক্ষ সিনেটে অনুমোদন পেলেই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর হবে।
প্রস্তাবিত আইনে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণই নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও মনোযোগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশটির হাইস্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য মুঠোফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের মতে, এতে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষার্থীরা সরাসরি সামাজিক যোগাযোগে বেশি যুক্ত হতে পারবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ বলেন, এই ভোট ফরাসি শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় একটি বড় অগ্রগতি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিশু ও কিশোরদের আবেগ কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়। সেগুলো যেন বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা অ্যালগরিদমের প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিশ্বব্যাপী শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবেও নজর কাড়ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে আইন পাস করে। সেই ধারাবাহিকতায় ফ্রান্স হলো দ্বিতীয় দেশ, যারা জাতীয় পর্যায়ে এমন কঠোর সিদ্ধান্তের পথে এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, ঘুমের সমস্যা বাড়ায় এবং উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি তৈরি করে। এসব কারণেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা জোরদার হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই নতুন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর দল রেনেসাঁর নেতা গ্যাব্রিয়েল আতাল আশা প্রকাশ করেছেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝির মধ্যেই সিনেট বিলটি অনুমোদন দেবে। সে ক্ষেত্রে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব হবে।
আইন কার্যকর হওয়ার পর বয়সসীমা না মানা বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে। এ জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করা বাধ্যতামূলক হবে। ইউরোপীয় পর্যায়ে সমন্বিতভাবে এমন ব্যবস্থা তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা নয়টি সংগঠন মনে করছে, শিশুদের সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিষিদ্ধ করার বদলে প্ল্যাটফর্মগুলোকেই আরও বেশি জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তাদের মতে, নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর সমাধান।
প্রস্তাবিত আইনের মূল দিকসমূহ
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| বয়সসীমা | ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ |
| ভোটের ফল | পক্ষে ১৩০, বিপক্ষে ২১ |
| স্কুল নীতি | হাইস্কুলে মুঠোফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ |
| কার্যকর সময় | সম্ভাব্যভাবে ১ সেপ্টেম্বর থেকে |
| বাস্তবায়ন ব্যবস্থা | বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি |
এই আইন পাসের মাধ্যমে ফ্রান্স শিশু ও কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।