বাংলাদেশের শিশু–কিশোর সাহিত্য ও সংগঠনের জগতে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই এক উজ্জ্বল নাম। ছোটদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা, হাসি–আনন্দ আর স্নেহে ভরা তাঁর যাদুকরী পরিচয় তাঁকে করে তুলেছে শিশুদের অনন্য বন্ধু ও পথপ্রদর্শক।
১৯২৫ সালের ৯ এপ্রিল ফরিদপুরের পাংশায় জন্ম নেওয়া দাদাভাই খুব অল্প বয়সেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন। সেই ছোট্ট শুরুই তাঁকে গড়ে তোলে দেশের শিশু–কিশোর সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃতে, প্রিয় লেখক ও দক্ষ সংগঠকে।
শিশুসাহিত্যে তাঁর যাত্রা শুরু ১৯৪৮ সালে, যখন আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ইত্তেহাদ পত্রিকার ‘মিতালী মজলিস’-এ শিশু বিভাগে কাজ শুরু করেন। পরে ‘শিশু সওগাত’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও ‘দৈনিক মিল্লাত’-এ কিশোর দুনিয়ার পরিচালক হিসেবে তিনি শৈশবের জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
১৯৫৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাক-এ যোগ দেওয়ার পর দাদাভাই হয়ে ওঠেন দেশের শিশু–কিশোর সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষ। তাঁর হাত ধরে ‘কচিকাঁচার আসর’ ছোটদের সৃজনশীলতা, স্বপ্ন আর আনন্দের একটি আপন ঠিকানা তৈরি হয়।
বাংলা সাহিত্যের বহু গুণী লেখক—সুফিয়া কামাল, ড. আবদুল্লাহ আল মুতী, আহসান হাবীব, শওকত ওসমান, হোসনে আরা, ফয়েজ আহমেদ, নাসির আলী—অনেকেই দাদাভাইয়ের অনুপ্রেরণায় শিশুদের জন্য লেখালেখিতে যুক্ত হন।
১৯৫৬ সালে তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের বৃহত্তম শিশু–কিশোর সংগঠন ‘কচিকাঁচার মেলা’। এখান থেকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গুণী মানুষ—সুলতানা কামাল, শিল্পী হাশেম খান, মাহবুব তালুকদার, স্থপতি রবিউল হোসাইন প্রমুখ।
তাঁর রচিত সর্বজনপ্রিয় ছড়া—“বাক বাক কুম পায়রা, মাথায় দিয়ে টায়রা…”, ‘হাট্টিমাটিম টিম’, ‘খোকন খোকন ডাক পাড়ি’, ‘আজব হলেও গুজব নয়’—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিশুদের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে। এছাড়া তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘আমার প্রথম লেখা’, ‘ঝিকিমিকি’, ‘কচি ও কাঁচা’, ‘ছোটদের আবৃত্তি’সহ অনেক বই।
শিশু সাহিত্য ও সংগঠনে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০০ সালে তিনি স্বাধীনতা পদক লাভ করেন—যা তাঁর আজীবন নিবেদন ও মমতার স্বীকৃতি।
৩ ডিসেম্বর ১৯৯৯ সালে দাদাভাই পৃথিবী ছাড়লেও তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি শিশুর হাসিতে, প্রতিটি ছড়ার সুরে, প্রতিটি সৃষ্টিশীল মনের স্বপ্নে।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে বাংলাদেশের শিশুদের চিরপ্রিয় দাদাভাই রোকনুজ্জামান খানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
খবরওয়ালা/টিএসএন



