খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাব, বসুন্ধরা সিটি আর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার—যেখানে একসময় বাদ্যযন্ত্র কিনতে ভিড় জমাতেন ক্রেতারা, সেখানে এখন নীরবতা। গিটার, তবলা, হারমোনিয়াম, কী-বোর্ডসহ সব বাদ্যযন্ত্র দোকানে সাজানো থাকলেও দিনের পর দিন বিক্রি নেই। বাদ্যযন্ত্র বিক্রেতারা বলছেন, গত এক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে এই বাজারে নেমে এসেছে অভূতপূর্ব মন্দা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বলেই এমন অবস্থা। বিক্রেতাদের মতে, বাদ্যযন্ত্রের বাজার মূলত নির্ভর করে কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্টেজ শোর ওপর। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় সৃষ্টি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকি, বারবার সমাবেশ-ধর্মঘট, এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অঘোষিত বিধিনিষেধের কারণে বড় কনসার্ট বন্ধ হয়ে গেছে। ছোটখাটো আসরও কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এতে বাদ্যযন্ত্র কেনার প্রবণতা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
একজন দোকান মালিক জানান, আগে দিনে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বিক্রি হতো, এখন ৩০ হাজার টাকাও ছুঁতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মানুষ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে ভয় পাচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশে কে আর কনসার্ট করবে? কনসার্ট নেই মানে বাদ্যযন্ত্রের বাজারও নেই।’
হার্ড রক ব্যান্ড ওয়ারফেজ-এর দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু মঞ্চ নয়, আমাদের জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত করেছে। শিল্পী থেকে বাদ্যযন্ত্র বিক্রেতা, সাউন্ড সিস্টেম, লাইটিং—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত।’
ঢাকার বিভিন্ন দোকান কর্মী জানিয়েছেন, নিয়মিত ক্রেতারা আসা বন্ধ করেছেন। যেসব প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় বাদ্যযন্ত্র সরবরাহ করত, তারাও এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। অনেকে দোকানের আকার ছোট করেছেন, কেউ কেউ অংশীদারিত্বে ব্যবসা চালাচ্ছেন। কর্মচারী ছাঁটাই হচ্ছে, কারিগররা বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন।
একজন সংগীতশিল্পী বলেন, ‘আগে শো করার সময় শিডিউল দিতে হিমশিম খেতাম। এখন কাজ নেই। রাজনৈতিক কারণে আউটডোর শো-এর অনুমতি মেলে না। ইনডোর শো দিয়ে জীবন চলে না। এতে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।’
সব মিলিয়ে ভোক্তাদের আগ্রহও কমছে বহুগুন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াংকা গোপ মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নতুন কাজ ও বড় অনুষ্ঠান কমে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কারাওকের প্রবণতা এবং যন্ত্রের দাম বৃদ্ধি। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় সাংস্কৃতিক অঙ্গন চাপে পড়েছে। মানুষ আর শখ করে গিটার কিনছে না। দাম বেড়েছে, আগ্রহ কমেছে—দুটো মিলে বাজারে ভয়াবহ মন্দা।”
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাদ্যযন্ত্রের বাজার টিকিয়ে রাখতে হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজনের সুযোগ সৃষ্টি না হলে এ মন্দা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিতে রূপ নেবে।