বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ সখ্যের ইতি: ১১ আসনে লড়বে মান্নার নাগরিক ঐক্য

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিশ্বস্ত সঙ্গী মাহমুদুর রহমান মান্না ও তাঁর দল নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত বিএনপির রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটল। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় এবং বিএনপির পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন না মেলায় এককভাবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছেন মান্না। ‘বদলে দাও বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে নাগরিক ঐক্য এবার নিজস্ব প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে ১১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। প্রার্থী বাছাইয়ের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে দীর্ঘদিনের মিত্রদের এই বিচ্ছেদ রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপোড়েন

বিচ্ছেদের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনটি। গত ২৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১০ জন মিত্র নেতার নাম উল্লেখ করে আসন সমঝোতার আশ্বাস দিয়েছিলেন, যেখানে বগুড়া-২ আসনে মাহমুদুর রহমান মান্নার নাম ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিএনপি সেই আসনে তাদের নিজস্ব নেতা শাহে আলমকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক প্রদান করে। একই চিত্র দেখা যায় ঢাকা-১৮ আসনেও, যেখানে মান্না প্রার্থী হলেও বিএনপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে সমর্থন দেয়। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে মান্না এবং তাঁর দল এককভাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

‘আগে রাজনীতি, পরে মন্ত্রিত্ব’—মান্নার অনড় অবস্থান

সম্প্রতি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাহমুদুর রহমান মান্নাকে একটি বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে তাঁকে পরবর্তী সরকারে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে মান্না এই প্রস্তাবকে ‘সদকা’ বা ‘ভিক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, “আমি রাজনীতি করব। রাজনীতি মানেই যেহেতু বর্তমানে নির্বাচন, তাই নির্বাচন ছাড়ব না। মন্ত্রী হলে পরে হব, না হলে না হব, কিন্তু ভিক্ষা নিয়ে রাজনীতি ছাড়ব না।”

নাগরিক ঐক্যের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা (একনজরে):

প্রার্থীর নাম নির্বাচনি আসন দলে পদবি
মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ সভাপতি
মোফাখখারুল ইসলাম রংপুর-৫ প্রেসিডিয়াম সদস্য
নাজমুস সাকিব আনোয়ার সিরাজগঞ্জ-১ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
মো. কবির হাসান জামালপুর-৪ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
শাহনাজ রানু পাবনা-৪ অর্থ বিষয়ক সম্পাদক
মেজর (অব.) আব্দুস সালাম কুড়িগ্রাম-২ কেন্দ্রীয় নেতা
মোহাম্মদ সামছুল আলম রাজশাহী-২ কেন্দ্রীয় নেতা
মোহাম্মদ রেজাউল করিম লক্ষ্মীপুর-২ কেন্দ্রীয় নেতা
স্বপন মজুমদার চট্টগ্রাম-৯ কেন্দ্রীয় সদস্য
এনামুল হক চাঁদপুর-২ কেন্দ্রীয় নেতা

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সম্পর্কের অবনতি

২০১৩ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাহমুদুর রহমান মান্না বিএনপির অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিলেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’-এর শরিক হিসেবে নাগরিক ঐক্য ৫টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়াই করেছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে গঠিত ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’-এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল এই দল। বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত বড় দলের ‘একলা চলো’ নীতির কারণে ছোট দলগুলো অবহেলিত হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। কেবল নাগরিক ঐক্য নয়, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডিও একই কারণে একক নির্বাচনের পথ বেছে নিয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রভাব

মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো একজন অভিজ্ঞ ও সুবক্তা রাজনীতিকের বিচ্ছেদ বিএনপির জন্য জোটবদ্ধ আন্দোলনের নৈতিক শক্তিতে কিছুটা ধাক্কা দিতে পারে। অন্যদিকে, ‘কেটলি’ প্রতীক নিয়ে ১১টি আসনে নাগরিক ঐক্যের অংশগ্রহণ নির্বাচনের মাঠকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলবে। মান্না স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি কোনো পদের মোহে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আদর্শ ও রাজপথের লড়াইকে বিসর্জন দেবেন না।

উপসংহার

বিএনপি ও নাগরিক ঐক্যের এই বিচ্ছেদ প্রমাণ করে যে, বৃহত্তর রাজনীতির মাঠে স্বার্থের সংঘাত অনেক সময় দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকেও ম্লান করে দেয়। মাহমুদুর রহমান মান্না এখন তাঁর নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনি ময়দানে ‘কেটলি’ প্রতীক কতটুকু হালে পানি পায়।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।