খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন রক্তক্ষয়ী এক গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ গত শুক্রবার ১৩তম দিনে পদার্পণ করেছে। আন্দোলনের শুরুটা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের হাতে হলেও এখন তা সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে মোড় নিয়েছে। চলমান এই সংঘাতের ভয়াবহতা এতটাই বেড়েছে যে, ইরান সরকারের কঠোর দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত আট শিশুসহ অন্তত ৪৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভের বিস্তৃতি ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ৩১টি প্রদেশের সব কটিতেই এখন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানসহ শতাধিক শহরের রাজপথে নেমেছেন কয়েক লাখ শিক্ষার্থী, তরুণী ও সাধারণ নাগরিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বৃহস্পতিবার রাত থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘নেটব্লকস’ জানিয়েছে, এই ডিজিটাল সেন্সরশিপের কারণে ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের তথ্য আদান-প্রদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত পরিসংখ্যান ও তথ্য |
|---|---|
| বিক্ষোভের বর্তমান স্থিতি | ১৩তম দিন (শুক্রবার পর্যন্ত)। |
| নিহতের সংখ্যা | ৪৫ জন (আইএইচআর-এর তথ্যমতে)। |
| আটক বা গ্রেপ্তার | ২,২৭০ জনের বেশি। |
| আন্দোলনের বিস্তার | ৩১টি প্রদেশের সব কটি এবং শতাধিক শহর। |
| প্রধান দাবি | অর্থনৈতিক সংস্কার ও বর্তমান সরকারের পতন। |
| বড় সহিংসতার কেন্দ্র | তেহরান, ইসফাহান, খোররামবাদ ও আরদাবিল। |
| যোগাযোগ ব্যবস্থা | দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও স্টারলিংক সংযোগ বিচ্ছিন্ন। |
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ট্রাম্পের হুমকি ইরানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ঘি ঢেলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপসারণের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার তিনি ইরানে সরাসরি হামলার হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যদি আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত হানবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই হস্তক্ষেপকামী মনোভাবের কড়া সমালোচনা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভকারীরা মূলত ট্রাম্পের ‘বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধা’ হিসেবে সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ বিক্ষোভের মূল কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের পর দেশটির অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশের বেশি এবং মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। সাধারণ মানুষ একদিকে দরিদ্র হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই শুরু হয়েছে ‘স্বৈরশাসক নিপাত যাক’ কিংবা নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভির সমর্থনে ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগান।
অবরুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যেমন রয়টার্স বা বিবিসি পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র যাচাই করতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ইসফাহান শহরে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘আইআরআইবি’ ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ও পরিস্থিতির অস্থিরতার কারণে টার্কিশ এয়ারলাইনসসহ কাতার ও দুবাইয়ের অন্তত ২০টি ফ্লাইট তেহরান যাত্রা বাতিল করেছে। নরওয়েভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইচআর-এর পরিচালক মাহমুদ আমিরি মোগাদ্দাম জানিয়েছেন, বুধবার ছিল এই বিক্ষোভের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন, যা প্রমাণ করে যে ইরান সরকার এখন সর্বোচ্চ সহিংস উপায়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে।
এই বিক্ষোভ কি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মতো বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে, নাকি নজিরবিহীন প্রাণহানির মাধ্যমে শেষ হবে—সেদিকেই এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তাকিয়ে আছে বিশ্ববাসী।