এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 8শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২৩ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এক উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের প্রথম নারী শহিদ, যাঁর আত্মত্যাগ আগামী প্রজন্মকে প্রেরণা জুগিয়েছে।
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড ক্লার্ক। অল্প বয়সেই প্রীতিলতা শিক্ষা ও মেধায় অসাধারণ কৃতিত্ব দেখান। ১৯২৭ সালে খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। এরপর ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্থান অর্জন এবং ১৯৩১ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ তাঁর অসামান্য প্রতিভার প্রমাণ।
শিক্ষাজীবনেই তিনি সমাজ ও জাতির মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। ইডেন কলেজে পড়ার সময় লীলা নাগের নেতৃত্বাধীন দীপালি সংঘের ‘শ্রীসংঘে’ এবং বেথুন কলেজে থাকাকালে কল্যাণী দাসের নেতৃত্বাধীন ছাত্রীসংঘে সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর চট্টগ্রামের নন্দনকাননের অপর্ণাচরণ স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব নিলেও তাঁর মন পড়ে ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গোপন দলিলপত্র পাঠ করে ও মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের প্রথম নারী সদস্য।
টেলিফোন-টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস, রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখল, জালালাবাদ যুদ্ধসহ নানা অভিযানে তিনি সরাসরি অংশ নেন। বিপ্লবী রামকৃষ্ণের সঙ্গে আলীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাৎ, ধলঘাট সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে বাঁচা, কল্পনা দত্তের সঙ্গে আত্মগোপন—এসবই তাঁর বিপ্লবী জীবনের অনন্য অধ্যায়।
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। ক্লাবটির প্রবেশদ্বারে লেখা ছিল ঘৃণ্য ও অবমাননাকর ঘোষণা—“কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ”। এই অপমানের প্রতিশোধেই বিপ্লবীরা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানে সাফল্যের পর প্রত্যাবর্তনের সময় প্রীতিলতা গুলিবিদ্ধ হন। ধরা না পড়তে তিনি পূর্বপ্রস্তুত রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড সেবন করে মাত্র ২১ বছর বয়সে শহিদ হন।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতি কেবল বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনই নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নতুন উদ্দীপনায় উজ্জীবিত করে তোলে। তিনি আজও ইতিহাসে এক অনন্য প্রেরণা—অদম্য সাহস, আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের দীপ্ত প্রতীক।
শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রণাম, বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা