খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
বৈশ্বিক বিমা শিল্পে পণ্য উন্নয়ন ও বিপণনের প্রথাগত দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। সাধারণত একটি নতুন বিমা পণ্য প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পৌঁছাতে ছয় থেকে ১২ মাস সময় ব্যয় হয়। তবে প্রযুক্তি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিনপালস (Synpulse) এবং এআই বিশেষজ্ঞ সংস্থা ৩৬০এফ (360F)-এর সাম্প্রতিক এক যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ‘এজেন্টিক এআই’ (Agentic AI) ব্যবহারের মাধ্যমে এই দীর্ঘ সময়সীমা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তাদের প্রকাশিত শ্বেতপত্র বা হোয়াইটপেপার—‘দ্য লাস্ট স্লো ইন্ডাস্ট্রি: হাউ এজেন্টিক এআই উইল রিশেপ দ্য ওয়ে ইনস্যুরেন্স প্রোডাক্টস আর বিল্ট’ (The Last Slow Industry: How Agentic AI Will Reshape the Way Insurance Products Are Built)—এ বিমা খাতের পণ্য উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আনয়নের এই নতুন রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বিমা পণ্য তৈরির যান্ত্রিক ও জটিল অংশগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করতে একটি ‘এজেন্টিক ইনস্যুরেন্স প্রোডাক্ট ফ্যাক্টরি’ (Agentic Insurance Product Factory) মডেলের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিমা পণ্য নকশার ক্ষেত্রে বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়, এই এআই মডেল সেগুলোকে দ্রুত সমাধান করতে সক্ষম:
প্রাইসিং মডেল বা মূল্য নির্ধারণ: ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে বীমার প্রিমিয়াম বা মূল্য নির্ধারণের গাণিতিক প্রক্রিয়াটি এআই দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে।
আন্ডাররাইটিং রুলস: বিমা গ্রহণের শর্তাবলী ও ঝুঁকি গ্রহণের নীতিমালা তৈরিতে এআই মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত ডাটা বিশ্লেষণ করে সঠিক রূপরেখা প্রদান করতে সক্ষম।
পলিসি কাঠামো: পলিসির আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো বিন্যাসের যান্ত্রিক কাজগুলো এই স্বয়ংক্রিয় কারখানার মাধ্যমে দ্রুত সম্পন্ন হবে।
একটি সরাসরি ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে দেখা গেছে যে, এআই সিস্টেমটি প্রথাগত সময়ের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ ব্যবহার করেই উৎপাদন-মানের কারিগরি বৈশিষ্ট্য (Technical Specifications) এবং পণ্য উদ্বোধনের প্লে-বুক বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে।
গবেষকদলের মতে, এজেন্টিক এআই মূলত ডাটা বা তথ্য-নির্ভর দলিলাদি তৈরির জটিল ও ক্লান্তিকর কাজগুলো নিজের কাঁধে তুলে নেয়। এর ফলে বিমা প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ বা কর্মীরা তথ্যের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে উচ্চতর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সৃজনশীল উদ্ভাবনী চিন্তায় অধিক সময় ব্যয় করার সুযোগ পান।
৩৬০এফ-এর প্রধান পণ্য কর্মকর্তা (Chief Product Officer) অনিরুদ্ধ সোমানি উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রযুক্তি বিমাকারীদের তাদের পণ্যগুলোকে দ্রুত পরীক্ষা (Testing) এবং পুনরাবৃত্তিমূলক উন্নয়নের (Iteration) সুযোগ করে দেয়। এর ফলে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত শিক্ষার মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করতে পারবে।
শ্বেতপত্রটিতে আরও বলা হয়েছে যে, এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর কেবল গতি বৃদ্ধিই করবে না, বরং বিমা পণ্যের ব্যক্তিগতকরণ বা পার্সোনালাইজেশনেও বড় ভূমিকা রাখবে। এআই-এর মাধ্যমে প্রতিটি গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী পলিসি ডিজাইন করা সহজ হবে।
এছাড়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এআই-এর মাধ্যমে উৎপাদিত ফাইলগুলো হবে ‘মেশিন-রিডেবল’ বা যন্ত্রপাঠযোগ্য, যা যেকোনো সময় অডিটিং বা নিরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এর ফলে বিমা কোম্পানিগুলো আইনি বাধ্যবাধকতা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আরও দক্ষ হয়ে উঠবে।
সিনপালস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুজিন সাজ-এর মতে, এই সাফল্য বিমাকারীদের জন্য বাজার পরিবর্তনের সাথে দ্রুত সাড়া দেওয়া আর্থিকভাবে এবং ব্যবহারিকভাবে সম্ভব করে তুলবে। এর ফলে অত্যন্ত সূক্ষ্মতা ও নির্ভুলতার সাথে বিমা সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
এই গবেষণাটি এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে বিমা পণ্যের এই ডিজিটাল রূপান্তর বৈশ্বিক স্তরেই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিমা খাতকে একটি মন্থর বা ধীরগতির শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এজেন্টিক এআই-এর অন্তর্ভুক্তি এই ধারণা পাল্টে দিচ্ছে। যেখানে আগে একটি পণ্য বাজারে আনতে এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উচ্চমানের বিমা পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এই প্রযুক্তিগত বিবর্তন কেবল বিমাকারীদের জন্য নয়, বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে চাওয়া সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
পরিশেষে, সিনপালস এবং ৩৬০এফ-এর এই উদ্যোগটি বিমা শিল্পের চিরাচরিত ‘বিল্ড সাইকেল’ বা পণ্য উন্নয়ন চক্রকে ভেঙে দিয়ে একে একটি আধুনিক, তথ্য-চালিত এবং অত্যন্ত দ্রুতগামী খাতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।