বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যে নতুন এক রেকর্ড গড়েছে সোনার বাজার। ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্ববাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা আগে থেকেই ধারণা দিচ্ছিল, ২০২৬ সালের কোনো এক সময় সোনার দাম এ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। তবে বছরের একেবারে শুরুতেই এমন ঘটনা ঘটবে, তা অনেক বিশ্লেষকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।
২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে সোনার দাম প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন বছরে দাম আরও দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যনীতিগত সিদ্ধান্ত, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আর্থিক বাজারের অনিশ্চয়তা একত্রে সোনার দাম বাড়ার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে টানাপোড়েন, ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং লাতিন আমেরিকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বাণিজ্যনীতি। সম্প্রতি তিনি সতর্ক করে বলেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে নতুন কোনো বাণিজ্যচুক্তিতে যায়, তবে দেশটির ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এমন বক্তব্য বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনিশ্চিত সময়ে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত শেয়ার বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। এর ফলেই শুধু সোনাই নয়, রুপার দামেও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। চলতি বছরে প্রথমবারের মতো রুপার দাম আউন্সপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। গত বছর রুপার দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল।
মূল্যস্ফীতির চাপ, মার্কিন ডলারের তুলনামূলক দুর্বলতা, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাপক হারে সোনা ক্রয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছরে আবার সুদের হার কমাতে পারে—এমন প্রত্যাশাও সোনার চাহিদা বাড়িয়েছে।
বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এ পর্যন্ত মোট প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সোনা দিয়ে মাত্র তিন থেকে চারটি অলিম্পিক আকারের সুইমিংপুল পূর্ণ করা সম্ভব। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর বড় অংশই ১৯৫০ সালের পর উত্তোলিত হয়েছে। সে সময় খননপ্রযুক্তির উন্নয়ন এবং নতুন সোনার ভান্ডার আবিষ্কারের ফলে উৎপাদন বেড়েছিল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাব বলছে, ভূগর্ভে এখনও প্রায় ৬৪ হাজার টন সোনা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে ভবিষ্যতে সরবরাহের গতি ধীর হতে পারে।
বিশ্ববাজারের প্রভাব দেশের বাজারেও স্পষ্টভাবে পড়েছে। সর্বশেষ এক দফা দাম বাড়ানোর পর দেশের ইতিহাসে সোনার সর্বোচ্চ দর নির্ধারিত হয়েছে।
দেশীয় বাজারে সোনার নতুন দর
| ক্যারেট/ধরন | ভরিপ্রতি মূল্য (টাকা) |
|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ২,৫৭,১৯১ |
| ২১ ক্যারেট | ২,৪৫,৫২৭ |
| ১৮ ক্যারেট | ২,১০,৪১৯ |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৭২,৯১৯ |
বিশ্লেষকদের ধারণা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যদি এভাবেই অব্যাহত থাকে, তবে সামনের দিনগুলোতে সোনার দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।