ব্রাহমা গরু—বাংলাদেশের খামারি ও বিত্তশালী মহলে বিলাসিতার প্রতীক। কোটি টাকার দাম, খাঁটি বংশমর্যাদা, এমনকি ছাগলও বিক্রি হয় ১২ লাখ টাকায়। তবে এই গরু যখন খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে, তখন আলোচনার ঝড় ওঠে। এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর, খামারি সাদিক এগ্রো, ইমরান হোসেন, মাংস ব্যবসায়ী খলিল—সঙ্গে শুল্ক বিভাগ, দুদক ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর—সব মিলিয়ে যেন এক ভিন্ন বাংলাদেশ। এত আলোচনার পর মানুষের মনে নতুনভাবে আগ্রহ জাগছে, এই ব্রাহমা জাতের গরু এত দাম কেন?
ব্রাহমা গরু একটি বিশেষ ও খ্যাতিমান ভারতীয়-আমেরিকান জাত, যার উৎপত্তি ১৮শ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে। বিশাল শরীর, উন্নত প্রজনন ক্ষমতা এবং দুধ ও মাংসের উচ্চ মান—এসব বৈশিষ্ট্যই এটিকে অন্যান্য গরুর থেকে আলাদা করে। ব্রাহমার সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দীর্ঘায়ু—সবই মূল্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে ব্রাহমা গরু কেবল পশুপালন নয়, এটি সমাজে মর্যাদা ও প্রতিভূতার প্রতীক। ধনী ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা প্রায়শই ঈদুল আযহা বা বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে ব্রাহমা গরু কিনে। এর ফলে ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং দাম আরও বেড়ে যায়।
ব্রাহমা গরু বাংলাদেশে সীমিতভাবে আমদানি ও প্রজনন হয়। ২০২১-২০২৪ সালের বিভিন্ন ঘটনা যেমন: যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি, শুল্ক বিভাগের জব্দ এবং কেন্দ্রীয় খামারে জটিল নিলাম—এসব দেখিয়েছে বাজারে সরবরাহ প্রায়ই চাহিদার চেয়ে কম। সীমিত সরবরাহে দাম স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
ব্রাহমা গরুর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও খামার ব্যবস্থা অন্য সাধারণ গরুর তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল। বিশেষজ্ঞ খামারিরা এদের যত্ন নিতে হয় উন্নত মানের চারণভূমি, ভ্যাকসিন ও নিয়মিত চিকিৎসা—সব মিলিয়ে মালিকের ব্যয় বেড়ে যায়, যা বিক্রির মূল্যে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশে ব্রাহমা গরু প্রায়শই নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়, যেখানে ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং কৌশল প্রয়োগ হয়। ২০২৪ সালের উদাহরণে দেখা গেছে, সাভারের কেন্দ্রীয় খামারে পাঁচটি গরুর নিলামে কিছু গরু সাদিক এগ্রো বা খলিলের কাছে গোপনভাবে চলে গেছে। নিলামের প্রক্রিয়া, মিডিয়ার প্রচার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার হাইপ—এসবই দাম বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোরবানির ঈদ, জাতীয় প্রদর্শনী বা ধনী ক্রেতাদের অনুষ্ঠান—এসব সময়ে ব্রাহমা গরুর মূল্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ এটি কেবল খাদ্য নয়, প্রতিষ্ঠান ও খামারির ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করে। প্রধানমন্ত্রী বা উচ্চ পর্যায়ের অতিথির সামনে প্রদর্শন হলে দাম আরও বাড়ে।
ব্রাহমা গরুর দাম শুধু বাণিজ্যিক কারণে নয়; এটি বংশমর্যাদা, সামাজিক মর্যাদা, সীমিত সরবরাহ, খামার ব্যয় এবং বাজার কৌশল—সব মিলিয়ে কোটি টাকার হতে পারে। বাংলাদেশে এই গরু এখনো সমাজ ও অর্থনীতির এক প্রতীক, যা ধনী ও প্রভাবশালী ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
খবরওয়ালা/এমএজেড



