খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে চৈত্র ১৪৩২ | ১৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা সাধারণ মানুষের কাছে এক ধরনের অরাজকতার শাসন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং আগামী নির্বাচনে জনগণ এর অবসান ঘটাবে।
শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আছে এবং রাজ্যের বর্তমান সরকারের সময় শেষের পথে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণ ভোটের মাধ্যমে জবাব দেবে। তিনি বলেন, রাজ্যের মানুষের ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্ধারক ভূমিকা পালন করে এবং সেই শক্তিই পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে।
মোদি অভিযোগ করেন, তৃণমূল সরকারের সময়ে বহু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগ রাজ্যে সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করতে নানা বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা প্রদানের উদ্যোগ এবং চা–বাগানের শ্রমিকদের সহায়তা সংক্রান্ত কর্মসূচি রাজ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ পায়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, বহু ক্ষেত্রে চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পেতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হলে সুশাসনের প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, জনগণের ভোটে সরকার পরিবর্তন হলে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য পাকা বসতবাড়ি, খাদ্য নিরাপত্তা ও মৌলিক সেবার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রতি অবমাননাকর আচরণের ঘটনাও রাজ্যের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব, এবং এই বিষয়টি রাজ্যের আদিবাসী সমাজ বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
এদিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য প্রায় ১৮ হাজার ৮৬০ কোটি রুপি ব্যয়ের বিভিন্ন অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, শিল্প অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জনসেবামূলক বিভিন্ন উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা যায়।
উল্লেখ্য, রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টি ২ মার্চ থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে “পরিবর্তন যাত্রা” নামে প্রচার কর্মসূচি শুরু করেছিল। এই কর্মসূচি ১০ মার্চ কলকাতায় এসে শেষ হয় এবং সেই উপলক্ষে ব্রিগেড ময়দানে এই বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে যোগ দিতে আসা কর্মী–সমর্থকদের একটি অংশের সঙ্গে তৃণমূল সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। কলকাতার গিরিশ পার্ক এলাকায় মিছিলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিচের সারণিতে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রধান দলগুলোর ফলাফলের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো।
| নির্বাচন | মোট আসন | তৃণমূল কংগ্রেস | ভারতীয় জনতা পার্টি | বামপন্থী দলসমূহ | কংগ্রেস |
|---|---|---|---|---|---|
| বিধানসভা নির্বাচন ২০১৬ | ২৯৪ | ২১১ | ৩ | ৩২ | ৪৪ |
| বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ | ২৯৪ | ২১৩ | ৭৭ | ০ | ০ |
| লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ | ৪২ | ২২ | ১৮ | ০ | ২ |
| লোকসভা নির্বাচন ২০২৪ | ৪২ | ২৯ | ১২ | ০ | ১ |
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টির ভোট ও আসন বৃদ্ধি রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিভিন্ন দল ইতিমধ্যে জনসংযোগ, প্রচার এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজে নেমেছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।