এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 1শে চৈত্র ১৪৩২ | ১৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলার বৌদ্ধিক ইতিহাসে কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটে নিভৃত নক্ষত্রের মতো—যারা আলো ছড়ান, কিন্তু প্রচারের কেন্দ্রে থাকেন না। তবু তাঁদের চিন্তা ও সাহসী প্রশ্ন সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে সমাজের গভীরে আলোড়ন তোলে। তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হলেন আরজ আলী মাতুব্বর—যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যুক্তিবাদী চিন্তা, সংশয়বাদ এবং মানবতাবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মননজগতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৩ পৌষে বরিশালের প্রত্যন্ত লামচরি গ্রামে তাঁর জন্ম। গ্রামটি ছিল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানবিহীন, ফলে শৈশবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। প্রায় তের বছর বয়সে গ্রামের বিদ্যোৎসাহী আব্দুল করিম মুন্সি নিজের বাড়িতে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করলে তিনি সেখানে পড়ার সুযোগ পান। সীতারাম বসাকের “আদর্শ লিপি” হাতে নিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; অর্থাভাবে মক্তবটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে মাত্র অক্ষরজ্ঞানেই।
কিন্তু এখানেই তাঁর জ্ঞানসন্ধানের পথ থেমে যায়নি। বরং এখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর প্রকৃত শিক্ষা—পৃথিবীর বিশাল পাঠশালায়। অক্ষরজ্ঞানকে পুঁজি করে তিনি শুরু করেন অবিরাম পাঠাভ্যাস। বরিশালের ছাত্রদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে পড়তেন, পরে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করেন বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরি ও ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরিতে। এই জ্ঞানসাধনায় তাঁকে সহায়তা করেছিলেন কলেজটির দর্শনের অধ্যাপক গোলাম কাদির। ক্রমে বিস্তৃত হতে থাকে তাঁর চিন্তার জগৎ এবং সেই জ্ঞানপিপাসাই পরবর্তীকালে তাঁকে নিজের গ্রামে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্বুদ্ধ করে “আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি”—যা তাঁর মননশীলতার এক স্থায়ী স্মারক।
জীবনের শুরু থেকেই তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হওয়া, খাজনা দিতে ব্যর্থ হয়ে জমি নিলামে চলে যাওয়া—এসব প্রতিকূলতা তাঁকে সংগ্রামী জীবনের দিকে ঠেলে দেয়। এই কঠিন সময়ে তাঁর একমাত্র অবলম্বন ছিলেন তাঁর মা। মায়ের মৃত্যুকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা তাঁর জীবনদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মায়ের স্মৃতি ধরে রাখতে তিনি আলোকচিত্রী এনে তাঁর মৃত মায়ের ছবি তুলতে চাইলে গ্রামবাসীরা একে ধর্মবিরোধী বলে মনে করে লাশ দাফনে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত বন্ধু ও আত্মীয়দের সহায়তায় তিনি মায়ের দাফন সম্পন্ন করেন। এই ঘটনাই তাঁর মনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়—কীভাবে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার মানুষের মানবিকতাকেও অস্বীকার করতে পারে।
এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় তাঁর সত্যের অনুসন্ধান। তিনি ধর্ম, সমাজ ও প্রচলিত বিশ্বাসকে অন্ধভাবে মেনে নিতে রাজি হননি; বরং যুক্তি, বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোকে তা বিচার করতে চেয়েছেন। তবে তাঁর অবস্থান কখনো ধর্মবিদ্বেষী ছিল না। বরং তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন—“আমাদের অভিযান কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়।” তাঁর বিশ্বাস ছিল, সত্যের নিরিখে যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই ধর্ম ও সমাজ আরও নির্মল ও মানবিক হয়ে উঠতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি বাংলা ভাষায় সংশয়বাদী দর্শনের এক শক্তিশালী ধারা তৈরি করেন। তাঁর মতে, সন্দেহ ও প্রশ্ন জ্ঞানের অপরিহার্য সূচনা। সমাজে প্রচলিত অন্ধ বিশ্বাস, অলৌকিকতার মোহ এবং যুক্তিহীন সংস্কারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন।
তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে “সত্যের সন্ধান” বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যা বাংলা ভাষায় সংশয়বাদী চিন্তার এক উল্লেখযোগ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া তিনি লিখেছেন “অনুমান”, “মুক্তমন”, “সৃষ্টির রহস্য” এবং “স্মরণিকা”। বিশেষত “সৃষ্টির রহস্য” গ্রন্থটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য একটি ক্ষুদ্র বিশ্বকোষের মর্যাদা পেয়েছে। তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজ, প্রাঞ্জল ও অলংকারহীন—কিন্তু যুক্তির দৃঢ়তায় তা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
বাংলার প্রখ্যাত মনীষীরাও তাঁর চিন্তার গভীরতায় মুগ্ধ হয়েছেন। আহমদ শরীফ তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন—আরজ আলী মাতুব্বরের লেখায় নতুন তত্ত্বের চেয়ে বেশি মুগ্ধ করে তাঁর মুক্তবুদ্ধি, সৎ সাহস ও উদার চিন্তা। একইভাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন—তিনি বর্ণনা করেননি, প্রশ্ন করেছেন; আর সেই প্রশ্নই পাঠককে চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করায়। কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন এক রেনেসাঁস মানুষ হিসেবে—যার দৃষ্টিতে সংশয়, আর যার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তি।
মানবতাবাদী এই চিন্তক জীবনের শেষ সময়েও মানবসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। মৃত্যুর পূর্বেই তিনি তাঁর চোখ ও দেহ দান করে যান বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ-এর জন্য। তাঁর ভাষায়—“ছাত্ররা যদি আমার দেহ কেটে কিছু শেখে, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।”
১৩৯২ বঙ্গাব্দে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা, তাঁর সাহসী প্রশ্ন এবং যুক্তির প্রতি তাঁর অটল আস্থা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি প্রমাণ করে গেছেন—জ্ঞান অর্জনের জন্য ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন মুক্ত চিন্তা, প্রশ্ন করার সাহস এবং সত্যের প্রতি নিরন্তর অনুসন্ধান। এই কারণেই আরজ আলী মাতুব্বর কেবল একজন চিন্তাবিদ নন; তিনি বাঙালি সমাজে যুক্তিবাদী মননের এক অনিবার্য আলোকবর্তিকা।
আজ এই মহান মনিষীর প্রয়ান দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক,খবরওয়ালা