খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
বাজারে সম্প্রতি দেখা মিলছে এক অচেনা ডালের—নাম মথ ডাল। এই ভারতীয় ডালটি রং মিশিয়ে ‘মুগ ডাল’ নামে বিক্রি হচ্ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় ক্ষতিকর রং টারটাজিন এর উপস্থিতি পাওয়ার পর সংস্থাটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে ভোক্তাদের সতর্ক করেছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে এই ডালের কোনো উৎপাদন নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মথ ডাল খরা–সহনশীল একটি স্থানীয় ভারতীয় ফসল, যার ৯৫ শতাংশ উৎপাদন হয় রাজস্থানের মরুভূমি এলাকায়। এই ডাল রাজস্থানে জনপ্রিয় খাদ্য উপাদান এবং স্থানীয়ভাবে পাঁপড় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বে ভারত ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রেও মথ ডাল উৎপাদিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রে এটি মূলত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি শুরু হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। প্রথম চালান আসে রাজশাহীর হিলি স্থলবন্দর দিয়ে—মোট ৬২ টন। বছর শেষে আমদানি দাঁড়ায় ৮ হাজার ৫১৬ টনে।
তবে ২০২৫ সালে আমদানিতে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা যায়। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ২০ হাজার ৬৯১ টন মথ ডাল এসেছে—যা আগের বছরের তুলনায় ৪০৮ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ৫৯টি প্রতিষ্ঠান ভোমরা, হিলি ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে এই ডাল আমদানি করছে।
বিএফএসএ কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যায়, মথ ডাল কিছুটা লম্বাটে ও গাঢ় বর্ণের, আর মুগ ডাল তুলনামূলক গোলাকার। তবে মথ ডালে হলুদ রং মেশালে তা সহজেই মুগ ডালের মতো দেখা যায়, ফলে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে পার্থক্য বোঝা কঠিন।
মূল্যও একটি বড় কারণ। এনবিআর তথ্য অনুযায়ী, মুগ ডাল আমদানিতে কেজিপ্রতি ১ ডলার ৯ সেন্ট (প্রায় ১৩৩ টাকা) খরচ হয়, যেখানে মথ ডাল আসে কেজিপ্রতি ৮৫ সেন্টে (প্রায় ১০৪ টাকা)। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ২৯ টাকা কম। তাই ব্যবসায়ীরা কম দামের মথ ডালকে রং মিশিয়ে ‘মুগ ডাল’ হিসেবে বিক্রি করে মুনাফা বাড়াচ্ছে।
মথ ডালের আমদানিকারক নিউ মাতৃভান্ডার–এর কর্ণধার বাদল তালুকদার জানান, ভারতের রাজস্থানে উৎপাদিত এই ডাল দিল্লিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আগের কিছু চালানে রং মেশানো থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ আছে বলে দাবি করেন তিনি।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৪৫ হাজার টন মুগ ডাল উৎপাদন হয় এবং প্রায় ৩০ হাজার টন আমদানি করতে হয়। কিন্তু মথ ডাল আসা শুরু হওয়ার পর মুগ ডাল আমদানি কমে গেছে নাটকীয়ভাবে।
২০২২–২৩ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি ছিল ২১ হাজার টন।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১৮ হাজার টনে, আর মথ ডাল আমদানি হয় ৯৯৬ টন।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি কমে ১০ হাজার ৯১৩ টনে, কিন্তু মথ ডাল বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪১৪ টনে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে মাত্র ২১৩ টন মুগ ডাল এসেছে, যেখানে মথ ডাল এসেছে ৬ হাজার ৭৯৯ টন।
বিএফএসএ পরীক্ষায় দেখা যায়, মুগ ডাল নামে বিক্রি হওয়া ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৮টিতে টারটাজিন রঙের উপস্থিতি রয়েছে। ২৮ অক্টোবর সংস্থাটি এনবিআরকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করে এবং রঙ মেশানো ডাল বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে।
সম্প্রতি টাঙ্গাইল শহরের ছয়আনী বাজারে রং মেশানো মথ ডাল মুগ ডাল হিসেবে বিক্রির দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, “খাদ্যশস্যে কোনোভাবেই কৃত্রিম রং মেশানো অনুমোদিত নয়। টারটাজিন রং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। আমরা এনবিআরকে নির্দেশ দিয়েছি যাতে আমদানির সময় মুগ ও মথ ডালের রং পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়।”
বাংলাদেশে বর্তমানে বাজারে মুগ ডালের জায়গা দখল করে নিচ্ছে মথ ডাল—কখনো নাম বদলে, কখনো রং মিশিয়ে। আর এতে ভোক্তাদের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা উভয়ই পড়ছে ঝুঁকির মুখে।