খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দিনা’ (IRIS Dina) ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার শ্রীলঙ্কার উপকূলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত যে দক্ষিণ এশিয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে, এটি তারই এক অশনিসংকেত। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ধ্বংস হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগেই এই যুদ্ধজাহাজটি ভারতের আমন্ত্রণে এক বহুজাতিক নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার তারা সমুদ্রের বুক থেকে একটি জরুরি বিপৎসংকেত (S.O.S) পায়। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তারা জাহাজের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি; সেখানে কেবল তেলের আস্তরণ এবং ভাসমান নাবিকদের দেখা যায়। বিরল এই টর্পেডো হামলায় জাহাজটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে নিমেষেই তলিয়ে যায়। উদ্ধারকারী দল এ পর্যন্ত ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং ৩২ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করে শ্রীলঙ্কার গালে শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এই হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
নয়াদিল্লি নিশ্চিত করেছে যে, আক্রান্ত ইরানি জাহাজটি ১৫ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের বিশাখাপত্তনমে অনুষ্ঠিত ‘এমআইএলএএন ২০২৬’ (MILAN 2026) এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ’-তে অংশ নিয়েছিল। ভারতের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আসা ৭৪টি দেশের নৌবহরের মধ্যে এটি অন্যতম ছিল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, জাহাজটি ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘সম্মানিত অতিথি’। ফলে ভারতের অতি সন্নিকটে এমন হামলার ঘটনায় নয়াদিল্লির কূটনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
| বিষয়বস্তু | বিস্তারিত তথ্য |
| আক্রান্ত জাহাজ | আইআরআইএস দিনা (IRIS Dina), ইরান |
| হামলার মাধ্যম | মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডো |
| অবস্থান | শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল, ভারত মহাসাগর |
| সর্বশেষ মহড়া | এমআইএলএএন ২০২৬ (ভারত) |
| নাবিক সংখ্যা | প্রায় ১৩০ জন |
| উদ্ধারকৃত নাবিক | ৩২ জন (জীবিত), ৮৭ জন (মৃত) |
| রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া | ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের তীব্র বাকযুদ্ধ |
এই ঘটনার পর ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান না করায় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস এবং বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর নীরবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁদের মতে, ভারতের নিজস্ব প্রভাবাধীন অঞ্চলে এ ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করে এই হামলা চালিয়েছে। জাহাজটি ভারতের আমন্ত্রণে এ অঞ্চলে অবস্থান করছিল, তাই এই হামলা ভারতের সার্বভৌম প্রভাবের ওপর একটি বড় ধাক্কা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনীকে নির্মূল করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। এই হামলা প্রমাণ করে যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের রণক্ষেত্র এখন আর কেবল পারস্য উপসাগর বা লোহিত সাগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিস্তৃত হয়েছে ভারত মহাসাগরের শান্ত জলরাশি পর্যন্ত।
ইরান এই হামলাকে ‘সমুদ্রে নৃশংসতা’ হিসেবে অভিহিত করে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছুড়ে যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।