নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
ইউরোপ, স্বপ্নের মহাদেশ। কেউ সেখানে যেতে চায় ভালো জীবনের আশায়, কেউ যুদ্ধ আর দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে। কিন্তু এই স্বপ্নের পথে যে সাগরটি রয়েছে, সেটিই অনেকের কাছে পরিণত হয় মৃত্যুকূপে, ভূমধ্যসাগর (Mediterranean Sea)। প্রতি বছর হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌকা বা ট্রলারে করে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এদের অনেকেই আর কখনও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না।
গত দুদিন আগের খবর। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ হবিগঞ্জের ৩৮ তরুণের। কোনো সন্ধান মেলেনি দুই সপ্তাহেও। এতে তাদের পরিবার ও স্বজনদের উৎকণ্ঠা দিন দিন বাড়ছে।
খবরে জানা যায়, ৩০ সেপ্টেম্বর ত্রিপলির উপকূল থেকে চারটি নৌকা ছেড়ে যায়, যার মধ্যে ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ জন যাত্রী ছিল একটি নৌকায়। সেই নৌকাটির কোনো সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজদের মধ্যে ১৪ জনের নাম পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে হবিগঞ্জ শহর ও বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারা রয়েছেন।
স্থানীয় অভিবাসী নেতারা বলছেন, এই ধরনের মানবপাচারকারী চক্র যুবকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে অক্ষম। যুবকদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ আদায় করার পরই তাদের বিপজ্জনক পথে পাঠানো হয়। তারা সবাইকে বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশকারী শীর্ষ তিন দেশের নাগরিক হলেন: বাংলাদেশি, মিসরীয় ও আফগান। বিশেষভাবে, মধ্য ভূমধ্যসাগর রুট ইউরোপে অনিয়মিত প্রবেশের প্রধান পথ হিসেবে চিহ্নিত। এই রুট দিয়ে ইতালিতে পৌঁছেছে মোট অবৈধ প্রবেশকারীর প্রায় ৪০ শতাংশ।
ফ্রনটেক্স শুক্রবার (১০ অক্টোবর) এ তথ্য প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর মাসেই মধ্য ভূমধ্যসাগর রুট ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন ৮ হাজার ৪৬ জন।
প্রতিবেদনের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে মোট ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪০০ জন অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। সংস্থার মতে, কঠোর নজরদারি ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার কারণে সামগ্রিকভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশ কমেছে।
ইউরোপে যাওয়ার সবচেয়ে পরিচিত অবৈধ রুটটি হলো লিবিয়া বা তিউনিসিয়া হয়ে ইতালি বা মাল্টা পৌঁছানো। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ—নাইজেরিয়া, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, সুদান কিংবা বাংলাদেশের মতো দেশ থেকেও মানুষ প্রথমে পৌঁছায় লিবিয়া সীমান্তে। তারপর মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তারা পড়ে ভয়াবহ এক বাস্তবতার মুখে।
লিবিয়ার মরুভূমি পার হতে অনেকেই প্রাণ হারান। পানির অভাব, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন—সবই এই যাত্রার অঙ্গ। এরপর অপেক্ষা থাকে ‘শেষ ধাপ’—ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া।
মানবপাচারকারীরা সাধারণত ৮০ থেকে ১৫০ জন মানুষকে গাদাগাদি করে বসায় একটি ছোট নৌকায়। অধিকাংশ নৌকাই তৈরি হয় প্লাস্টিক বা পাতলা অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে, যেগুলো সাগরের ঢেউ সহ্য করতে পারে না। অনেক সময় অতিরিক্ত যাত্রী ও জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় মাঝ সাগরেই নৌকা উল্টে যায়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভূমধ্যসাগরে ইউরোপমুখী পথেই কমপক্ষে ৩,০০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ অনেক নৌকা ডুবে যায় কোনো খবর ছাড়াই।
ইতালি, গ্রীস ও মাল্টা উপকূলে কোস্টগার্ড ও কিছু বেসরকারি সংস্থা প্রতিদিন উদ্ধার অভিযান চালায়। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিবাসনবিরোধী নীতির কারণে উদ্ধারকৃত মানুষদের প্রায়ই বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়।
লিবিয়ার আটক শিবিরগুলোর অবস্থা ভয়াবহ—অপর্যাপ্ত খাদ্য, মারধর, যৌন নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত। তবুও প্রতিদিন কেউ না কেউ নতুন করে এই যাত্রায় পা রাখছে, কারণ পিছনে ফেরার উপায় নেই।
বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর শত শত তরুণ লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর পথে রওনা দেন ইউরোপে যাওয়ার আশায়। অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের ভিসায় গিয়ে সেখান থেকে পাচারচক্রের মাধ্যমে সাগরপথে ইউরোপের পথে যাত্রা করেন।
অনেকের পরিবার পরিশ্রমের টাকা খরচ করে তাদের পাঠায়, কিন্তু তারা হারিয়ে যান সাগরের ঢেউয়ে। লিবিয়ার মিজদাহ ও সাবরাথা অঞ্চলে একাধিক গণকবর পাওয়া গেছে, যেখানে রয়েছে দক্ষিণ এশীয় ও আফ্রিকান অভিবাসীদের মরদেহ।
যে ইউরোপকে অনেকেই স্বাধীনতা ও উন্নতির প্রতীক মনে করেন, সেখানে পৌঁছানোর আগেই হাজারো স্বপ্ন ডুবে যায় সাগরের গভীরে। কেউ পৌঁছালেও শুরু হয় নতুন সংগ্রাম—অবৈধ অবস্থান, কাজের অনিশ্চয়তা ও বর্ণবৈষম্যের বাস্তবতা।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, দারিদ্র্য, যুদ্ধ আর বেকারত্বের বাস্তবতা যদি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তবে কি তাদের এই মরিয়া যাত্রাকে কেবল ‘অবৈধ’ বলেই দায়মুক্ত হওয়া যায়?
খবরওয়ালা/এমএজেড