খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক বিচিত্র চিত্র ফুটে উঠেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও ঋণের সামগ্রিক স্থিতিতে বড় ধরণের পতন ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে ভোক্তা ঋণের স্থিতি কমেছে প্রায় ২২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে এই খাতের গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার মধ্যে এই পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিসংখ্যানের আড়ালে প্রকৃত চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ভোক্তা ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা মোট ব্যাংকঋণের ৮.৬৩ শতাংশ। জুনের শেষে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার ৬২১ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৯.৯৫ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই বড় পতন মূলত খেলাপি ঋণ অবলোপন এবং অনেক ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার ফল। অন্যদিকে, গ্রাহক সংখ্যা ৪৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ লাখ ৮ হাজার জনে। গ্রাহক বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক বা সিটি ব্যাংকের মতো কিছু ব্যাংকের ক্ষুদ্র অংকের ‘ডিজিটাল লোন’ প্রদানকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
খাতভিত্তিক ঋণ ও গ্রাহকের তুলনামূলক চিত্র
ভোক্তা ঋণের বিভিন্ন উপ-খাতে ঋণ ও গ্রাহকের হ্রাস-বৃদ্ধির একটি তুলনামূলক ছক নিচে তুলে ধরা হলো:
| খাতের নাম | জুন শেষে স্থিতি (কোটি টাকা) | সেপ্টেম্বর শেষে স্থিতি (কোটি টাকা) | পরিবর্তনের ধরণ |
|---|---|---|---|
| আবাসন ঋণ | ৩১,৪৩৭ | ৩০,৭৮৬ | হ্রাস |
| পরিবহন/গাড়ি ঋণ | ৬,৬০২ | ৫,৭০৯ | হ্রাস |
| ইলেকট্রনিক্স ও আসবাবপত্র | ৪৪,৬৫২ | ৩৪,৮৩৮ | বড় ধরণের হ্রাস |
| এফডিআর-এর বিপরীতে ঋণ | ৩০,৪০৯ | ২৫,০৮৮ | হ্রাস |
| পেশাজীবী ও চিকিৎসক ঋণ | ১,১৬৬ | ১,০০২ | হ্রাস |
| ডিপিএস-এর বিপরীতে ঋণ | ৭,২০২ | ৫,৩৪২ | হ্রাস |
| ক্রেডিট কার্ড ও শিক্ষা | বৃদ্ধি পেয়েছে | বৃদ্ধি পেয়েছে | ইতিবাচক |
পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও ব্যাংকের কৌশল
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যাংকের তারল্য সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় ঋণ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া, খেলাপি হওয়া ভোক্তা ঋণ অবলোপনের সুযোগ সহজ করায় অনেক ব্যাংক তাদের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে ঋণের স্থিতি কমিয়ে দেখিয়েছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিগত ও ডিজিটাল ঋণে ভালো করছে। বিশেষ করে বেতনের বিপরীতে ঋণ প্রদান বাড়ছে, কারণ এসব ক্ষেত্রে খেলাপির ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
ঋণের সীমা ও সুদহারের প্রভাব
বর্তমানে একজন গ্রাহক ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা, গাড়ি কিনতে ৬০ লাখ টাকা এবং আবাসন খাতে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। যদিও এসব ঋণের সুদহার ১১ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবুও ক্রেডিট কার্ডের ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ এখন দীর্ঘমেয়াদী বড় ঋণের চেয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ক্ষুদ্র ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে গ্রাহক সংখ্যার উল্লম্ফনে।
সব মিলিয়ে, ব্যাংকিং খাতের এই প্রবণতা নির্দেশ করে যে, সাধারণ গ্রাহকরা এখন বড় বিনিয়োগের চেয়ে ক্ষুদ্র ও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোও বড় অংকের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের চেয়ে ক্ষুদ্র ও নিরাপদ ঋণে মনোযোগ দিচ্ছে।