খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে মাঘ ১৪৩২ | ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে উপনীত হয়েছে। সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক সরাসরি বার্তায় ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এখন তেহরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের আওতাভুক্ত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের এই হুঁশিয়ারি অঞ্চলটিকে এক গভীর সামরিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাঘচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তার দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, যদিও ইরানের পক্ষে সরাসরি আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানা সম্ভব নয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের উদ্দেশ্যে শক্তিশালী নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক তখনই ইরান এই পাল্টা বার্তা দিল। আরাঘচি পরিষ্কার করেছেন যে, ইরান প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করতে চায় না, তবে ওইসব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো কোনোভাবেই রেহাই পাবে না।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল রয়েছে। এই বিশাল ভাণ্ডারটি ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে তাদের ‘খুররমশাহর’ এবং ‘সেজজিল’ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মার্কিন স্থাপনাগুলো এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে।
ইরানের মিসাইল রেঞ্জের আওতায় থাকা প্রধান মার্কিন ঘাঁটিসমূহ:
| ঘাঁটির নাম | অবস্থান (দেশ) | গুরুত্ব ও ধরণ |
| আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি | কাতার | মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিমান ঘাঁটি। |
| ৫ম নৌবহর সদর দপ্তর | বাহরাইন | মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ড সেন্টার। |
| আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি | সংযুক্ত আরব আমিরাত | কৌশলগত ড্রোন ও যুদ্ধবিমান পরিচালনার কেন্দ্র। |
| ইনজিলিক বিমান ঘাঁটি | তুরস্ক | ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি। |
| ক্যাম্প আরিফজান | কুয়েত | মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশাল লজিস্টিক হাব। |
| আল-তানফ গ্যারিসন | সিরিয়া | কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থল সামরিক কেন্দ্র। |
ইরানের এই ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন হাত গুটিয়ে বসে নেই। সম্ভাব্য ইরানি আক্রমণ থেকে নিজেদের সেনা ও স্থাপনা রক্ষা করতে মধ্যপ্রাচ্যে ‘থাড’ (THAAD) এবং ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। জর্ডান, কুয়েত এবং সৌদি আরবের মতো মিত্র দেশগুলোতে অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের মতে, যেকোনো মূল্যে নিজ দেশের সৈন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
যুদ্ধের দামামা বাজলেও পর্দার আড়ালে ওমানে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কোনো চাপ তেহরান মেনে নেবে না।
সামগ্রিকভাবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক নীতি এবং ইরানের ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে কোনো সুরাহা না হলে, এই আধিপত্যের লড়াই যে কোনো সময় একটি বিধ্বংসী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।