খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি শেষ হওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসেই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান তাঁর মন্ত্রিত্ব পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। ১ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, সোমবার সকালে তিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বর্তমান নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় এই হেভিওয়েট নেতার পদত্যাগ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও নানামুখী গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রণালয় পরিচালনা, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনে মতপার্থক্য এবং রাঙামাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ এই আকস্মিক পদত্যাগের নেপথ্য কারণ হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান তাঁর দায়িত্ব ছাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতাকে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালননে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়াতে আমার বর্তমান পদ (মন্ত্রী) থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি।’ তবে মন্ত্রীর এই আনুষ্ঠানিক কারণকে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী ও অনুসারীরা মেনে নিতে পারছেন না।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ সরকার বা সরকারি কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা না হলেও, দিনভর রাজনৈতিক মহলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে:
মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব ও প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগ: রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই দীপেন দেওয়ান এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন। এই মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে এবারই প্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বাইরে থেকে কোনো প্রতিনিধিকে যুক্ত করা হয়। পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি দীপেন দেওয়ানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পার্বত্য এলাকার বাইরে থেকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের এই বিষয়টি পাহাড়ের অধিবাসীদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, কারণ ঐতিহ্যগতভাবে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উভয় পদই পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের প্রাপ্য বলে মনে করা হতো। তবে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এই দূরত্বের কথা অস্বীকার করে জানিয়েছেন যে, তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে।
পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ও প্রশাসক নিয়োগ: পদত্যাগের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে আলোচনা এসেছে তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদের পুনর্গঠন নিয়ে মতভিন্নতা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই পরিষদগুলো পুনর্গঠনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি এই বিষয়ে সময়ক্ষেপণ করছিলেন। অন্য একটি সূত্রের দাবি, মন্ত্রী তাঁর নিজের পছন্দ অনুযায়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর কোনো স্বজনকে বসানোর চেষ্টা ছিল, যা তিনি করতে পারেননি।
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। চুক্তি সম্পাদনকারী সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে সরকারের আনুষ্ঠানিক আলোচনার পক্ষে ছিলেন তিনি। জেএসএসের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি আলোচনা হোক—এমন ইচ্ছা তিনি প্রকাশ করেছিলেন।
ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান দীপেন দেওয়ানের জীবন এবং রাজনৈতিক পথচলার সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় ও পর্যায় | সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ঐতিহাসিক রেকর্ড |
| শিক্ষা ও প্রাথমিক পেশা | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন এবং জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগদান। |
| রাজনীতিতে পদার্পণ | ২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান। |
| দলীয় নেতৃত্ব ও পদ | ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি এবং ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক মনোনীত। |
| ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন | পার্বত্য রাঙামাটি আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১,৭০,৩২২ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী। |
| পারিবারিক ঐতিহ্য | তাঁর পিতা সুবিমল দেওয়ান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। |
| বর্তমান মন্ত্রিসভার অবস্থা | গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সরকার গঠনের সাড়ে তিন মাস পর ১ জুন ২০২৬ তারিখে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ। |
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল বিকেলে রাঙামাটি শহরে তাঁর অনুসারী ও সমর্থকেরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার এবং তাঁকে মন্ত্রিত্বে পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটি জেলা বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ শহরের কাঁঠালতলী দলীয় কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধ করে এবং বিক্ষোভ প্রতিবাদ সভা করে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, কোনো শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং অদৃশ্য কোনো চাপের কারণে মন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় গণমাধ্যমকে বলেন, “দীপেন দেওয়ান শারীরিকভাবে অসুস্থ নন।” তিনি আরও মনে করেন, দীপেন দেওয়ানের এই আকস্মিক পদত্যাগ বিএনপির রাজনীতি, পাহাড়ের সার্বিক স্থিতিশীলতা এবং পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের সুসম্পর্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাজামং মারমাও দাবি করেন যে, পদত্যাগপত্রে প্রদর্শিত কারণটি সঠিক নয় এবং দীপেন দেওয়ান মানসিক ও শারীরিকভাবে মন্ত্রিত্ব চালানোর মতো পূর্ণ সক্ষমতা রাখেন।
বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছিল। এই সরকারের সাড়ে তিন মাসের মাথায় দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর বর্তমানে মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী ২৪ জন এবং প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ২৩ জন। এর বাইরে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োজিত আছেন। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এত কম সময়ের মধ্যে কোনো পূর্ণ মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা অত্যন্ত বিরল।