খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৬ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় তুচ্ছ বিরোধের জেরে শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন হত্যা মামলায় ৫ জন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। রোববার (২৬ এপ্রিল, ২০২৬) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আসামিদের উপস্থিতিতে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-১ আদালতের বিচারক মোতাছিম বিল্লাহ এই রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ১৫ বছর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রায় প্রদান করা হলো।
আদালতের নথি ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ১৪ মে রাতে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার রমনপুর গ্রামে ইমরান হোসেনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এর আগের দিন, যখন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গোলামুর রহমান সেলিম নিহত ইমরানের বাড়িতে গিয়ে তার বোনের মোবাইল নম্বর দাবি করেন। পরদিন অর্থাৎ ১৪ মে রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে সাকিব বিশ্বাস ও বুলবুল আহমেদ ইমরানের বাড়িতে গিয়ে তাকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান।
পরবর্তীতে সেলিমের নেতৃত্বে ইমরানকে রমনপুর গ্রামের কালাম মোল্লার দোকানের পাশে একটি ব্রিজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ইমরানের মাথার পেছনে ও তালুতে আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করে আসামিরা পালিয়ে যায়। ঘটনার সময় সদর উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সালেহা ইসলাম ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার পথে মরদেহটি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের খবর দেন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্তে উঠে আসে যে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় মাস আগে প্রতিবেশী আব্দুল্লাহ আল মতিন বাবুর সঙ্গে তুচ্ছ বিষয়ে নিয়ে ইমরানের বিরোধ ও মারামারি হয়েছিল। যদিও গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছিল, তবুও সেই বিরোধের জেরে এবং বোনের মোবাইল নম্বর চাওয়া নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষিতে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ঘটনার পরদিন ১৫ মে ২০১১ তারিখে নিহতের বাবা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান মাস্টার বাদী হয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর বুলবুল আহমেদ গোলাপ জানান, আদালত মোট ২৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক শেষে এই রায় ঘোষণা করেন। একই রায়ে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় নূরু ভূইয়া নামে এক আসামিকে খালাস প্রদান করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও শাস্তির বিবরণ:
| আসামির নাম | শাস্তির ধরণ | আর্থিক দণ্ড | বর্তমান অবস্থা |
| সাকিব বিশ্বাস | যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড | ২০,০০০ টাকা (অনাদায়ে ৩ মাস কারাদণ্ড) | কারাবন্দী |
| কালাম মোল্লা | যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড | ২০,০০০ টাকা (অনাদায়ে ৩ মাস কারাদণ্ড) | কারাবন্দী |
| আব্দুল্লাহ আল মতিন বাবু | যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড | ২০,০০০ টাকা (অনাদায়ে ৩ মাস কারাদণ্ড) | কারাবন্দী |
| বুলবুল আহমেদ | যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড | ২০,০০০ টাকা (অনাদায়ে ৩ মাস কারাদণ্ড) | পলাতক |
| গোলামুর রহমান সেলিম | যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড | ২০,০০০ টাকা (অনাদায়ে ৩ মাস কারাদণ্ড) | পলাতক |
আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে একজন উদীয়মান শিক্ষার্থীর প্রাণহানি ঘটিয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণে আসামিদের সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি আদালতে উপস্থিত থাকলেও অন্য দুইজন পলাতক রয়েছেন। আদালত পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করার নির্দেশ দিয়েছেন। নিহতের পরিবার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত সাজা কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।