খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে কার্তিক ১৪৩২ | ১২ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বছরজুড়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরও সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩৫ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর পরিকল্পনা থাকলেও এর মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের বই ২১ কোটি ৯০ লাখ। শুধুমাত্র নবম শ্রেণির বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ কোটি। গত অক্টোবরের মধ্যে এসব বই ছাপা শেষ করার লক্ষ্য ছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। কিন্তু এখন পর্যন্ত নবম শ্রেণির মাত্র ২০ লাখ বই ছাপা হয়েছে, আর ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ১৪ কোটি ৫০ লাখ বই ছাপা এখনো শুরুই হয়নি। ফলে আগামী মার্চের আগে, অর্থাৎ শিক্ষাবর্ষের দুই মাস পর্যন্ত বই না পেয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে ১ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী।
গত বছর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বই ছাপায় বিলম্বকে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিল। তবে এবার দেরির দায় কেউ নিতে চাইছে না। ছাপাখানার মালিকরা অভিযোগ করছেন, এনসিটিবির কর্মকর্তাদের গাফিলতিই মূল কারণ। অন্যদিকে এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় বিলম্ব ঘটেছে। তাদের দাবি, মন্ত্রণালয় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের ক্রয়াদেশ অনুমোদন না দিয়ে টেন্ডার বাতিল করেছিল, যার ফলে জটিলতা তৈরি হয়। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভাঙতেই পুনরায় টেন্ডার দেওয়া হয়। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিটেন্ডারেও সিন্ডিকেট ভাঙেনি; বরং বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। অনেক ছাপাখানা অস্বাভাবিকভাবে কম দরে কাজ নিয়েছে, ফলে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
জানা গেছে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের প্রতি ফর্মায় সরকারের বাজেট ছিল ৩ টাকা ১৫ পয়সা, অথচ কয়েকটি প্রেস সিন্ডিকেট করে ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ২ টাকা ৯ পয়সা পর্যন্ত দর দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আনন্দ প্রিন্টার্সের মালিক রব্বানী জব্বার ও মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. কবিরের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট এই কাজ করছে। তাদের নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানোর বিষয়টি পূর্ববর্তী শিক্ষাবর্ষের ল্যাব টেস্টেও ধরা পড়েছিল।
বর্তমানে ১০৩টি ছাপাখানা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ করছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের অর্ধেকের বেশি কাজ পেয়েছে রব্বানী ও কবিরের প্রতিষ্ঠান।
এনসিটিবি চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়, অক্টোবরের মধ্যে ছাপা শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের দিকে সরকারের ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটি অনুমোদন না দেওয়ায় টেন্ডার বাতিল হয়। রিটেন্ডারে অনুমোদন পেতে বাড়তি আড়াই মাস সময় লাগে। নবম শ্রেণির বইয়ের ক্রয়াদেশ অনুমোদনও ঝুলে ছিল দীর্ঘদিন। ২৭ অক্টোবর নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (নোয়া) জারি হয়, যার পর চুক্তি করতে সময় লাগবে আরও ২৮ দিন। এতে ডিসেম্বরের আগে ছাপানো শুরু সম্ভব নয়। এরপর ৭০ দিন ছাপানোর সময় পাবে ছাপাখানাগুলো, ফলে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বই প্রস্তুত হলেও বিতরণে সময় লাগবে আরও কয়েক সপ্তাহ। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের নোয়া জারি হয়েছে সম্প্রতি, চুক্তি কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাপা শুরু করা যাবে না।
এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাকেও অনেকেই এ সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডে এখনো আগের সরকারের সুবিধাভোগীরা সক্রিয়। ছাত্রদল এক বিবৃতিতে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. রিয়াদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রবিউল কবীর চৌধুরীর অপসারণ দাবি করেছে, তাদের অভিযোগ—এই কর্মকর্তারা সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা করছেন।
এনসিটিবির তত্ত্বাবধান থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৩০ শতাংশ বই নিম্নমানের কাগজে ছাপানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বই উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত প্রি-ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্ট (পিডিআই) তদারকি করে, আর জেলা-উপজেলায় সরবরাহের পর মান যাচাই করে পিএলআই এজেন্ট। প্রাথমিকের পিডিআই হিসেবে কাজ করছে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)। এর মালিক মো. মনিরের বিরুদ্ধে ছাপাখানার মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিম্নমানের কাগজকে ভালো মানের সার্টিফিকেট দিতে ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করছেন। এক ছাপাখানা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা ২ লাখ টাকা দিয়েছেন, আরও ৫ লাখ চাওয়া হয়েছে; টাকা না দিলে অনুমোদন আটকে দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ বিষয়ে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)-এর মালিক মো. মনির জানান, কিছু ছাপাখানার মালিক তাকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেছেন, তবে তিনি কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করেননি এবং কাগজের মান নিয়ে কোনো আপস করা হচ্ছে না।
খবরওয়ালা/টিএসএন