খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৪ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মালয়েশিয়ার বীমা খাত ক্রমবর্ধমানভাবে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে—এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছেন ট্রান্সফরমেটিভ ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-এর প্রধান নির্বাহী রঙ্গম বীর। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, চিকিৎসা ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বয়স্ক জনসংখ্যার দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ঐতিহ্যগত ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেল আর কার্যকর থাকছে না।
মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘এশিয়ান ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স x ইন্স্যুরেন্স এশিয়া সামিট ২০২৬’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, বীমা কোম্পানিগুলো তাদের মূল দায়িত্ব—ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা—থেকে সরে গিয়ে এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সম্মতি (কমপ্লায়েন্স), বিক্রয় প্রক্রিয়া তদারকি এবং অর্থপাচার প্রতিরোধের মতো বিষয়ের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে।
রঙ্গম বীরের ভাষায়, “একসময় আমরা গ্রাহকদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করতাম। এখন সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে কমপ্লায়েন্স, ভুল বিক্রয় রোধ এবং নিয়ন্ত্রক চাহিদা পূরণ।” এই পরিবর্তন বীমা কোম্পানিগুলোকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে, কারণ বর্তমান বিশ্বে ঝুঁকিগুলো ক্রমশ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে এবং আলাদাভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি উল্লেখ করেন, আধুনিক অর্থনীতিতে ঝুঁকির প্রকৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে পৃথকভাবে আন্ডাররাইটিং, সাইবার নিরাপত্তা, অপারেশনাল বা আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হতো, এখন সেগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে একটি ঝুঁকির প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত বীমা ক্ষতির পরিসংখ্যানও এই প্রবণতাকে স্পষ্ট করে।
| বছর | বৈশ্বিক বীমা ক্ষতি (ডলার) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ২০২৪ | প্রায় ১৩৭ বিলিয়ন | জলবায়ু বিপর্যয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি |
| ২০২৫ (প্রক্ষেপণ) | প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন | বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে |
| ২০৩০ (প্রক্ষেপণ) | ৭০০ বিলিয়নের বেশি | বহুমাত্রিক ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্ভাবনা |
গত কয়েক বছর ধরেই এই ক্ষতির পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা বীমা খাতের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।
রঙ্গম বীরের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অব্যাহত থাকলে ২০৩২ সালের মধ্যে আজকের বীমাকৃত সম্পত্তির ৩০% থেকে ৪০% অর্থনৈতিকভাবে ‘অবীমাযোগ্য’ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, এসব ঝুঁকি কভার করা বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য আর লাভজনক থাকবে না।
এছাড়া তিনি বলেন, প্যারামেট্রিক বীমা (যেখানে নির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়) ঐতিহ্যবাহী বীমা পণ্যের তুলনায় তিনগুণ দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাজার কাঠামোর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্বয়ংচালিত যানবাহন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অপারেশনাল পরিবেশ—এসব ক্ষেত্রে পুরোনো তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। অতীতের ক্ষতির তথ্য দিয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি নির্ধারণ করা আর সম্ভব হচ্ছে না।
রঙ্গম বীর বলেন, “আমরা এখনো অতীতের ডেটা ব্যবহার করে মূল্য নির্ধারণ করছি, অথচ বর্তমান ঝুঁকিগুলো রিয়েল-টাইমে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতনির্ভর।”
জীবন ও স্বাস্থ্য বীমা খাতেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। এশিয়ায় বয়স্ক জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও ৬০ বা ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের অনেক ক্ষেত্রে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা তাদের জন্য বীমা সুবিধা সীমিত করে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালয়েশিয়ায় গত কয়েক বছরে চিকিৎসা খাতে মূল্যস্ফীতি ১২% থেকে ১৫% পর্যন্ত বেড়েছে, যা বীমা প্রিমিয়াম বাড়াতে বাধ্য করছে এবং গ্রাহকদের জন্য কভারেজ ব্যয়বহুল করে তুলছে।
রঙ্গম বীরের মতে, এই পরিস্থিতিতে বীমা কোম্পানিগুলোকে শুধু নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে একটি কৌশলগত বিষয় হিসেবে দেখতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানজুড়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধুমাত্র গভর্ন্যান্স বা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ। ভবিষ্যৎমুখী মূল্য নির্ধারণ, শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই দ্রুত পরিবর্তন আনা জরুরি।
সবশেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, বীমা শিল্প বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ঝুঁকির বাস্তবতায় খাপ খাওয়াতে না পারলে, এই খাতের জন্য ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।