খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
বাগেরহাটের মোংলায় সুন্দরবন সংলগ্ন কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের হারবাড়িয়া স্টেশনে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মোংলা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় ৪৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কোস্টগার্ডের অভিযানে নিখোঁজ দাবি করা এক জেলের স্ত্রী, মা ও বোন। ইতিমধ্যে কোস্টগার্ড ও পুলিশের যৌথ অভিযানে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, মোংলা উপজেলার জয়মনির ঠোঁটা এলাকার মিরাজ শেখ নামের এক জেলে নিখোঁজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। নিখোঁজ মিরাজের পরিবার ও গ্রামবাসীর দাবি, গত ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ডের সদস্যরা মিরাজকে জয়মনির ঠোঁটা এলাকা থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে গত দুই মাস ধরে পরিবারটি মিরাজের সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করেও কোনো হদিস পায়নি।
এই নিখোঁজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার সকালে কোস্টগার্ডের সাথে জয়মনির ঠোঁটা এলাকার বাসিন্দাদের তীব্র বাকবিতণ্ডা ও উত্তেজনা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশনে ব্যাপক সংঘাত ও হামলায় রূপ নেয়।
বৃহস্পতিবার রাতে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের হারবাড়িয়া স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার মো. শাহিদুর রহমান শাহিন বাদী হয়ে মোংলা থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ১১ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আসামিরা এলাকায় গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে বেআইনিভাবে জনতা সমবেত করে। এরপর তারা ১৫-২০টি নৌকায় করে হারবাড়িয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের পন্টুন এলাকায় জড়ো হয়। উত্তেজিত জনতা সরকার ও কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিদ্বেষমূলক, হিংসাত্মক ও উসকানিমূলক স্লোগান দিতে দিতে স্টেশনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হামলাকারীরা ধারালো দা, ছুরি, কিরিচ, লোহার রড, বঁটি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে কোস্টগার্ড সদস্যদের ওপর চড়াও হয়, তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়। হামলা চলাকালীন পন্টুনের জানালার কাচ, চেয়ার, ফ্যান, লাইট ও টেবিলসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া কোস্টগার্ডের একটি আউটবোর্ড ইঞ্জিন, একটি আরবি-১০০১ বোট, নয়টি সোলার প্যানেল, চারটি বড় ব্যাটারি, গ্যাসের চুলা ও প্লাস্টিকের টেবিল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই হামলায় সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আত্মরক্ষা ও সরকারি অস্ত্রাগারসহ মালামাল রক্ষার স্বার্থে কোস্টগার্ডের কর্তব্যরত সদস্যরা ৪৫টি ফাঁকা গুলি ছুড়ে উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে বাধ্য হন বলে এজাহারে নিশ্চিত করা হয়েছে।
দায়েরকৃত এই মামলার ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে নিখোঁজ মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুনকে। এছাড়া মিরাজের বোন লিজা ইসলামকে ২ নম্বর এবং মা তাসলিমা বেগমকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর এই তিন নারীকে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে আটক করা হয়েছিল। মামলার এজাহারনামীয় ৪৪ জন আসামির প্রায় সবার বাড়িই মোংলা উপজেলার জয়মিন গ্রামে।
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বৃহস্পতিবার রাতের মামলার পর কোস্টগার্ড ও পুলিশের একটি যৌথ দল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তিনজন মামলার এজাহারনামীয় আসামি। শুক্রবার বিকেলে আসামিদের বাগেরহাট আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাঁদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার হারবাড়িয়া স্টেশনে সংঘটিত এই হামলার পেছনে কেবল সাধারণ গ্রামবাসী নয়, বরং বনদস্যু এবং তাদের সহযোগীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ধারণা করছে কোস্টগার্ড। শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম এই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, কোস্টগার্ডের সুন্দরবনকেন্দ্রিক নিয়মিত মাদক, চোরাচালান ও জলদস্যুবিরোধী অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং কোস্টগার্ডের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। ঘটনার প্রকৃত নেপথ্য কারণ ও জড়িতদের খুঁজে বের করতে পুলিশ ও কোস্টগার্ডের যৌথ তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।