যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে সুখবর: সম্পাদিত হলো ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তি

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ দর-কষাকষির পর সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত অতিরিক্ত বা পাল্টা শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে।

চুক্তির মূল দিক ও শুল্ক সুবিধা

ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির তাৎক্ষণিক ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। এর ফলে পূর্বের ২০ শতাংশ শুল্ক বর্তমানে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে সাধারণ শুল্ক (১৫%) এবং নতুন পাল্টা শুল্ক (১৯%) মিলিয়ে এখন সর্বমোট শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো কাঁচামাল আমদানির শর্তযুক্ত সুবিধা। এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা বা কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে বাংলাদেশে তৈরি করা পোশাক যখন পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হবে, তখন সেই পোশাকের ওপর কোনো প্রকার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হবে না। এটি দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের শুল্ক পরিবর্তনের বিবর্তন:

সময়কাল পাল্টা শুল্কের হার বিশেষ সুবিধা/মন্তব্য
২ এপ্রিল ২০২৫ (ঘোষণা) ৩৭% ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক ঘোষণা।
৭ জুলাই ২০২৫ ৩৫% আলোচনার পর ২ শতাংশ হ্রাস।
৭ আগস্ট ২০২৫ (কার্যকর) ২০% ব্যাপক দর-কষাকষির পর ২০ শতাংশে স্থির।
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (চুক্তি) ১৯% চুক্তি পরবর্তী বর্তমান হার।
মার্কিন তুলায় তৈরি পোশাক ০% (পাল্টা শুল্ক) যুক্তরাষ্ট্রে তুলা রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা।

ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ঢাকা থেকে ভার্চ্যুয়ালি এতে যুক্ত হন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হন। তবে মাঠ পর্যায়ে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল।

রপ্তানিকারকদের প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক প্রভাব

দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ এই চুক্তিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর তুলা আমদানি করে। এখন শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে তুলা আমদানির পরিমাণ আরও বাড়বে, যা পরোক্ষভাবে মার্কিন কৃষকদেরও লাভবান করবে।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য বাংলাদেশ রপ্তানি করে এবং ২০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা এবং এলএনজি আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মত ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই চুক্তিতে কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়া গেলেও এর দীর্ঘমেয়াদি শর্তগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ওপর কী কী বাধ্যবাধকতা আসবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ, এই চুক্তির ধারাবাহিকতা ও শর্ত পালনের দায়িত্ব বর্তাবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামীকাল মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।