খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে ইরানের ওপর নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই অভিযানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। মার্কিন এই আকস্মিক আগ্রাসনের জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান। দুই পরাশক্তির এমন চরম সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ থামাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় তিনটি পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা চালায়। মূলত সেই ঘটনার কড়া প্রতিক্রিয়া জানাতেই এই নতুন সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এই হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সামরিক কমান্ড সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের সামরিক হুমকি কমিয়ে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন এই বিমান হামলার পরপরই ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বুধবার ইরানের ওপর চালানো এই হামলার তীব্রতা মঙ্গলবারের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
আমেরিকার এই আক্রমণের জবাব দিতে ইরানও বেশি সময় নেয়নি। তেহরান টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করেছে, তারা আকাশেই বেশ কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এই ঘটনার পর পাশ্ববর্তী দেশ কাতার সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, মঙ্গলবার জাহাজে হামলার উপযুক্ত প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব বাজারে সরবরাহ হওয়া মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইরানের একটি বিশাল কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজে হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে কূটনীতিকদের ধারণা, চলমান আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই তেহরান এই কৌশল নিয়েছে। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন হুঁশিয়ারি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মূল্য না দিয়ে পার পাবে না। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা কেবল ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থার অধীনেই নিশ্চিত হবে, কোনো বিদেশি চাপে নয়।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা একেবারে মিলিয়ে গেছে। তুরস্কের ন্যাটো সম্মেলনে যাওয়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকরা ট্রাম্পের কাছে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার কাছে এই চুক্তি এখন মৃত এবং তিনি ইরানের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না। তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হবে না আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি যাই হোক, খুব দ্রুত এর সমাপ্তি ঘটবে। এদিকে সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৮০ ডলারে ঠেকেছে।
ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মার্কিন হামলাগুলো মূলত দেশটির দক্ষিণ উপকূলের হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মধ্যে ইরানের বৃহত্তম নৌঘাঁটি সমৃদ্ধ বন্দর আব্বাস, পাকিস্তান সীমান্তের চাবাহার এবং কোনারাক শহর প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইরানের মেহের সংবাদ সংস্থা জানায়, হামলায় চাবাহারের সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানশাহর শহরের বিমানবন্দরে হামলায় একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন এবং উত্তরাঞ্চলীয় আক্কালা শহরের একটি রেলসেতুতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের এক গণমাধ্যমে ।
সামরিক এই আগ্রাসনের ঠিক আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন এই হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে। ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে এসে নিজেদের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তন করতে পারে। এমনকি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিকল্পও তাদের ভাবনায় রয়েছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী মিশন এই হামলার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।