খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: 17শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশে আইন শৃঙ্খলার অবনতির ফলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর; ১৩ মাসে ১৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটেছে ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে এ সংবাদ জানা গেছে।
এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই আধিপত্য বিস্তার, পূর্ববিরোধ, মাদক ও পারিবারিক বিরোধের জেরে ঘটেছে। দুয়েকটি ছাড়া সব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে প্রকাশ্যে। নিয়মিত বিরতিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকাবাসীর আতঙ্ক কাটছে না।
১০ জুলাই বিকেলে প্রকাশ্যে মোহাম্মদ রাসেল (৩৫) নামের এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের মোবারক আলী টিলা এলাকায় নিহত হন তিনি। রাসেলের লাশ ধানক্ষেতে ফেলে যায় হামলাকারীরা। তার একটি হাত ছিল বিচ্ছিন্ন।
২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের সিকদারপাড়া এলাকায় প্রতিবেশীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন দিনমজুর রহমত উল্লাহ (৪৮)। ইট ভাঙানোর মাত্র ২০০ টাকা মজুরি নিয়ে বিরোধে প্রাণ যায় তার। এ ঘটনায় দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পুলিশ প্রধান অভিযুক্ত আশরাফ আলীকে গ্রেপ্তার করে। এ হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে লালানগর ইউনিয়নের ঘাগডড়া খিলের মোগল তালুকদারপাড়া মসজিদের পাশে দুর্বৃত্তরা মো. খোরশেদ আলম (২৮) নামে এক যুবককে গলা কেটে হত্যা করে।
ঘটনাস্থল থেকে তাঁর বাড়ি থেকে মাত্র ৭০ ফুট দূরে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা আব্দুল খালেক বাদী হয়ে ১০-১২ জনকে আসামি করে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ মামলার প্রধান আসামি সাইফুল আজমকে গ্রেপ্তার করে।
আবদুল খালেকের ভাষ্য, ছেলে হত্যায় যারা জড়িত, তাদেরই আসামি করেছেন। একজন গ্রেপ্তার হলেও অন্যরা অধরা। এ কারণে তাঁর পুরো পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
পারিবারিক বিরোধে হত্যা
গত ১৫ জানুয়ারি ভোরে রাজানগর ইউনিয়নের ঠাণ্ডাছড়ি নতুনপাড়ায় হত্যার শিকার হন গৃহবধূ জরিনা বেগম (২৪)। স্বজনের অভিযোগ, আগের রাতে তাঁর সঙ্গে স্বামী শাহ আলম ওরফে হাসানের ঝগড়া হয়। এর জের ধরেই হাসান বালিশচাপা দিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করেন। মামলার পর পুলিশ হাসানকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
গত ৬ জুন দুপুরে গোডাউন গরুর বাজারে জামাতার হাতে হত্যার শিকার হন ওসমান গণি (৫০)। তাঁকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেন হোসেন। ঘটনার পরপরই তাঁকে ধাওয়া দিয়ে ধরে ফেলেন স্থানীয় লোকজন। পরে হোসেনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে পারুয়া ইউনিয়নে পাওয়া যায় গৃহবধূ রুমা আক্তারের (২৬) লাশ। তিনি উপজেলার চন্দ্রঘোনা কদমতলী ইউনিয়নের বনগ্রাম লালপাহাড় এলাকার মীর আহম্মদের মেয়ে। স্বজনের ভাষ্য, রুমার স্বামী নেজামের বাড়ি পোমরা ইউনিয়নে। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর যৌতুক চেয়েছিলেন। না পেয়ে রুমাকে হত্যা করেন।
আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুন
২৭ আগস্ট রাতে দুর্বৃত্তরা রুবেল (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে। পদুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হারুয়ালছড়ি ইকোপার্কের কাছের এক বাড়িতে হত্যার শিকার হন তিনি। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারের বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। রুবেল রাঙ্গুনিয়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত।
২০ জুন সরফভাটা ইউনিয়নের কাইন্দারকুল এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছিলেন শিবুই মারমা। পথে সন্ত্রাসীরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। শিবুই সরফভাটা মারমাপাড়ার চিংচালা মারমার ছেলে। পাহাড় থেকে লেবু এনে বিক্রি করতেন শিবুই। কয়েকটি সূত্রে হত্যার পেছনে মাদক-সংক্রান্ত বিরোধের কথা জানা গেছে। তবে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার বা রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি।
গত ১০ এপ্রিল ভোরে সরফভাটা-বোয়ালখালী সীমান্তে লেমুছড়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন আওয়াইমং মারমা (৩৩)। তিনি উপজেলার সরফভাটা বড়খোলাপাড়া এলাকার অংসিপ্রু মারমার ছেলে। লেবুবাগান পাহারা দিতে গেলে তাঁকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এলাকাবাসীর ধারণা, আধিপত্য বিস্তার ও মাদক নিয়ে বিরোধে এ হামলা হয়। তবে প্রকৃত রহস্য পুলিশ এখনও উন্মোচন করতে পারেনি। গ্রেপ্তার হয়নি কেউই।
গত বছর ৭ আগস্ট একই ইউনিয়নের সুখবিলাস গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন আবদুল মজিদ (২৮)।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন তিনি মারা যান। স্বজনরা জানান, জমি-সংক্রান্ত বিষয়ে আবদুল মজিদের সঙ্গে প্রতিপক্ষের আব্দুল আজিমের তর্ক হয়। এক পর্যায়ে আজিমের লোকজনের লাঠির আঘাতে আহত হন তিনি।
একই বছর ২ ডিসেম্বর রাতে সরফভাটায় তুচ্ছ ঘটনার জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন প্রবাসী সেকান্দর চৌধুরী মামুন (৪২)। এ ঘটনায় তাঁর ভাই মামলা করেন। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
চলতি বছর ২৫ মার্চ সরফভাটার মীরেরখিল বাজারে নিজ দোকানে হামলার শিকার হন আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম তালুকদার (৭০)। দুর্বৃত্তরা তাঁকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ফেলে যায়। পরদিন হাসপাতালে মারা যান তিনি। নুরুল ইসলাম সরফভাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন। এ ঘটনায় মামলা হয়নি।
২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাত ১টার দিকে লালানগর ইউনিয়নের ইসলামিয়াপাড়ায় গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে ফিরছিলেন রবিউল হোসেন রুবেল (২৬)। পথে জনতার পিটুনিতে প্রাণ যায় তাঁর। রুবেল চন্দ্রঘোনা-বনগ্রাম এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে। তিনি লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে শ্বশুরবাড়ি থাকতেন। পরদিন তাঁর স্ত্রী কাজলী আক্তার থানায় হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় ইউপি সদস্যসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ওই বছরের ১৮ আগস্ট পুলিশ মাদ্রাসাছাত্র ইমরান নবী জুয়েলের (১৬) লাশ উদ্ধার করে। আগের দিন নিখোঁজ হয় সে। এ ঘটনায় জুয়েলের বাবা নবীর হোসেন দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ তার এক সহপাঠীকে গ্রেপ্তার করে।
যা বলছে পুলিশ
২৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা-কদমতলি ইউনিয়নের গীতাভবন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এসেছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পুলিশ উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির চেষ্টা করছে। তারা সতর্ক অবস্থানে আছেন। রাঙ্গুনিয়ার সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কোনো ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি পুলিশের সহায়তায় এগিয়ে আসতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি সাব্বির মোহাম্মদ সেলিমের ভাষ্য, তারা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। শিগগিরই দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
ওসি সেলিম আরও বলেন, রুবেল হত্যাকাণ্ড ঘটেছে মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। পুলিশ সব মোটিফ ও আসামি ধরার কাজ শেষ করে এনেছে। শিগগিরই ভালো সংবাদ দিতে পারবেন। হত্যাকাণ্ডটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঘটেছে। এই থানাকে দুজন এসআই দিয়ে চালাতে হচ্ছে। তারপরও আসামি গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। সে জন্য এই মুহূর্তে অনেক কিছুই বলতে পারছেন না।
রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি এটিএম শিফাতুল মাজদার বলেন, যেখানে ঘটনা ঘটছে তারা সেখানেই যাচ্ছেন। মামলা নথিভুক্ত করার পর জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেন।
বিশিষ্টজনের ভাষ্য
রাঙ্গুনিয়ায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেন রাঙ্গুনিয়া মানবাধিকার কমিশনের সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, মানুষ যাদের ওপর আস্থা রাখবে, তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা কঠোর নয়। পুলিশ হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটনেও ব্যর্থ। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম জজকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দিদারুল আলম মনে করেন, রাঙ্গুনিয়ায় যে হারে হত্যাকাণ্ড ঘটছে, এতে সাধারণ মানুষের দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়। হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা আইনের আওতায় আসছে না। তাই অন্য অপরাধীরাও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুলিশ আসামি ধরতে সাহস পাচ্ছে না। তারা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলেই হত্যাকাণ্ড কমে আসবে।
খবরওয়ালা/এমইউ