দুবাইয়ে সংগীতশিল্পী লাকি আলীর কনসার্টে উপস্থিত হয়ে তার পরিবেশনায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় ভারতীয় র্যাপার ইয়ো ইয়ো হানি সিং। ১৬ আগস্ট দুবাইয়ের কোকা-কোলা এরিনায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে সামনের সারিতে বসে লাকি আলীর গান উপভোগ করতে দেখা যায় তাকে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওর সঙ্গে লাকি আলীকে ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান হানি সিং।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে লাকি আলী যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন, কনসার্টের পরিবেশনাতেও তার ছাপ স্পষ্ট ছিল। কয়েক দশক ধরে শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে থাকা তার একাধিক গান অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়। পরিচিত সুর ও কণ্ঠের টানে দর্শকদের অনেকেই গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। ফলে আয়োজনটি শুধু একটি মঞ্চ পরিবেশনা না থেকে লাকি আলীর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার স্মরণীয় একটি পর্বে পরিণত হয়।
কনসার্ট চলাকালে হানি সিংকে মুঠোফোনে মঞ্চের বিভিন্ন মুহূর্ত ধারণ করতেও দেখা যায়। তিনি লাকি আলীর পরিবেশনার ভিডিও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় প্রকাশ করেন। সেই পোস্টে লাকি আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে কিংবদন্তি হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। একই সঙ্গে স্বাধীন ও নিজস্ব সংগীতচর্চার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন।
লাকি আলীর প্রতি হানি সিংয়ের এই প্রকাশ্য শ্রদ্ধা দুই ভিন্ন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীর মধ্যে একটি বিশেষ যোগসূত্রও সামনে এনেছে। একদিকে লাকি আলী নব্বইয়ের দশক থেকে নিজের স্বতন্ত্র গায়কী ও সংগীতভাবনার মাধ্যমে শ্রোতাদের আলাদা একটি অভিজ্ঞতা দিয়েছেন। অন্যদিকে হানি সিং আধুনিক ভারতীয় জনপ্রিয় সংগীতে র্যাপ ও সমসাময়িক সংগীতধারাকে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
লাকি আলীর সংগীতজীবনের বড় বাঁক আসে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘সুনোহ’ অ্যালবামের মাধ্যমে। অ্যালবামটি তাকে স্বতন্ত্র সংগীতধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তার কণ্ঠ, গানের কথা এবং পরিবেশনের ধরন সে সময়ের প্রচলিত সংগীতধারার তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছিল। বিশেষ করে ‘ও সনম’ গানটি তার পরিচিতি আরও বিস্তৃত করে এবং পরবর্তী সময়ে এটি তার সংগীতজীবনের অন্যতম জনপ্রিয় সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়।
লাকি আলীর জনপ্রিয়তার পরিধি শুধু একক অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। চলচ্চিত্রের গানেও তার কণ্ঠ শ্রোতাদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। ‘এক পল কা জিনা’, ‘না তুম জানো না হাম’ এবং ‘সফরনামা’র মতো গান বিভিন্ন সময়ে তার সংগীতপরিচয়কে আরও শক্তিশালী করেছে। এসব গানে তার কণ্ঠের স্বাভাবিকতা এবং আলাদা পরিবেশনাশৈলী শ্রোতাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন তৈরি করেছে।
তার সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিজস্বতার প্রতি অটল থাকা। মূলধারার চলচ্চিত্রনির্ভর সংগীতের বাইরে থেকেও লাকি আলী নিজের সুর, কণ্ঠ ও পরিবেশনাশৈলী দিয়ে আলাদা শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছেন। সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন বদলালেও তার পুরোনো গান নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের মধ্যেও পরিচিতি ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে, হানি সিংয়ের সংগীতযাত্রা ভারতীয় জনপ্রিয় সংগীতের ভিন্ন একটি পর্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করে। র্যাপ, ছন্দনির্ভর পরিবেশনা এবং আধুনিক সংগীতের নানা উপাদানকে জনপ্রিয় করে তুলতে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ফলে তার মতো সমসাময়িক একজন জনপ্রিয় শিল্পীর কাছ থেকে লাকি আলীর মতো প্রবীণ ও স্বতন্ত্র ধারার শিল্পীর প্রশংসা সংগীতের প্রজন্মগত ধারাবাহিকতাকেও সামনে এনেছে।
দুবাইয়ের কনসার্টে হানি সিংয়ের উপস্থিতি তাই কেবল একজন শিল্পীর আরেকজন শিল্পীর অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়ার ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের সংগীতভাষা ধরে রাখা লাকি আলীর প্রতি সমসাময়িক এক জনপ্রিয় শিল্পীর প্রকাশ্য সম্মানের উদাহরণ। একই সঙ্গে এই ঘটনা দেখিয়েছে, সংগীতের ধরন ও প্রজন্ম আলাদা হলেও একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অন্য প্রজন্মের শিল্পীদের কাছেও সমানভাবে সম্মানিত হতে পারে।

