খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে চৈত্র ১৪৩২ | ৮ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা প্রশমনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সম্ভাব্য বৃহৎ সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা—সবকিছুর প্রেক্ষাপটে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না হলে বড় ধরনের সামরিক হামলার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। এই ঘোষণার ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয় এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘোষণা দেন যে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ফ্রন্টেও তা কার্যকর হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং স্থায়ী শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও উভয় পক্ষ নিজেদের কৌশলগত সাফল্য দাবি করেছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০টি শর্ত উপস্থাপন করে, যা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিচে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| ক্রম | শর্তের বিবরণ |
|---|---|
| ১ | ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা |
| ২ | হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা |
| ৩ | পারমাণবিক কর্মসূচিতে সমৃদ্ধিকরণের অনুমোদন |
| ৪ | প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার |
| ৫ | পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা বাতিল |
| ৬ | নিরাপত্তা পরিষদের সব প্রস্তাব প্রত্যাহার |
| ৭ | আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার বিধিনিষেধ শিথিল |
| ৮ | যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ প্রদান |
| ৯ | মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার |
| ১০ | সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ |
ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র এই শর্তগুলোর প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে, যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। তবে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে একটি নীতিগত সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা একটি শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও ইরান প্রথমে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, পরবর্তীতে নিজেদের ১০ দফা প্রস্তাবের মাধ্যমে আলোচনায় ফিরে আসে।
আগামী ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বিস্তারিত আলোচনা হবে। পাকিস্তান এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং এর মাধ্যমে অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা করা হচ্ছে।
যদিও যুদ্ধবিরতি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, বিশ্লেষকদের মতে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে—এ ধরনের চুক্তি প্রায়ই ভঙ্গুর হয়ে থাকে। মতপার্থক্য, আস্থাহীনতা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব যেকোনো সময় আবার উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
তাই এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সাময়িক বিরতি, নাকি স্থায়ী শান্তির সূচনা—তা নির্ভর করছে আসন্ন আলোচনার সাফল্য ও উভয় পক্ষের আন্তরিকতার ওপর।