খবরওয়াল প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ জুন ২০২৫
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের ১২টি দাবি এবং সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ফলে এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রমে। এগুলো হলো টাইম স্কেল সিলেকশন গ্রেড, সিনিয়র শিক্ষকের পর পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই, প্রধান শিক্ষক ও জেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতি জটিলতা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদে সিনিয়র শিক্ষকদের পদায়ন, প্রবেশপদ নবম গ্রেড ধরে সঠিক পদসোপান, উপজেলা মাধ্যমিক অফিসে শিক্ষকদের পদায়ন, সকল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনের জনবল কাঠামো তৈরি, নতুন পদ সৃষ্টি, বেতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, মাধ্যমিক স্তরের পদগুলোতে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক কর্মকর্তা থেকে পদায়ন, সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় বিযুক্তকরণ, শতকরা ১০ ভাগ অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করা নেই, বদলি নীতিমালা সহযীকরণ। শিক্ষকদের দাবি প্রশাসনের মনোযোগের অভাবে এই সমস্যাগুলো সমাধান হচ্ছে না।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকারা দ্বিতীয় শ্রেণির ১০ম গ্রেডে স্থায়ী রাজস্ব খাতভুক্ত পদে যোগদান করলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী ৭(২) ও ৭(৯) অনুচ্ছেদে বিধান থাকা সত্ত্বেও এখনো কোনো মঞ্জুরি আদেশ পাননি অধিকাংশ শিক্ষক।
অন্যদিকে একই স্তরের প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারগণ ২০০১ সালে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ২০২৩ সালে তাদের ২০০১ সাল থেকেই ওই নিয়ম অনুযায়ী টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড মঞ্জুর করা হয়। এতে করে স্পষ্ট বৈষম্যের শিকার হন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
শিক্ষকরা হাইকোর্টে রিট করে জয়লাভ করলেও কোনো অগ্রগতি নেই। ২০১৯ সালের ২ মে দেওয়া রায়ে আদালত সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল প্রদানের নির্দেশ দেয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আপিল দায়ের করা হয়। আদালত আপিলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুনানির জন্য বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠান, গত ৪ মে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সরকারের আপিল খারিজ করে দেয়।
সিনিয়র শিক্ষক পদ থাকলেও তাতে পদোন্নতির জন্য কোনো বিধান নেই। ৭ বছর চাকরির পর পদোন্নতি পাওয়ার কথা থাকলেও নীতিমালার অভাবে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। একইসঙ্গে সিনিয়র শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের বেতন গ্রেড (নবম) এক হওয়ায় পদোন্নতিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে সিনিয়র শিক্ষক পদ সৃষ্টি না থাকায় শিক্ষকদের পদোন্নতির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদের ৫০ শতাংশ কোটা সিনিয়র শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও তা বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে ৯৭-৯৮ শতাংশ শিক্ষক একই পদে চাকরি করে অবসরে যাচ্ছেন।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জনবল কাঠামো একরকম নয়। কোনো এক শিফটের স্কুলে ২৬টি পদ থাকলেও, কোথাও তা ৭টি বা ৮টি—একেবারেই অস্থিরতা ও বৈষম্যের উদাহরণ।
এ ছাড়া হিন্দু ধর্ম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সহকারী গ্রন্থাগারিক ও ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পদ নেই অনেক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এতে পাঠদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর প্রাপ্য অগ্রিম বর্ধিত বেতন পাওয়া নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ডেপুটেশন কিংবা ছুটির সময় বিকল্প শিক্ষক না থাকায় পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত পদ সৃষ্টির দাবি অনেক পুরনো।
নিয়োগপত্রে ২ বছর পর বদলির সুযোগ থাকলেও বদলি নীতিমালায় সেটি ৩ বছরে নির্ধারণ করা হয়েছে। আবার প্রশাসনিক পদে সারা বছর বদলি চালু থাকলেও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তা সীমিত, যা চরম অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ব্যানবেইজ, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও এনসিটিবির পদগুলোতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক/কর্মকর্তারা পদায়নের সুযোগ পাচ্ছেন না। অথচ তারা মাধ্যমিক স্তরের সবচেয়ে অভিজ্ঞ জনবল।
প্রাথমিক শাখা থাকা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ১৯৮৪ সালের পর আলাদা প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকলেও এখনো শাখাগুলো রয়ে গেছে। এতে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় ১,৪০০টি সিনিয়র শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া বিদ্যালয় পরিদর্শক ও জেলা শিক্ষা অফিসারদের পদোন্নতির বেতন গ্রেড ও মর্যাদা এক হওয়ায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা বাতিলযোগ্য বলেছে।
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, বাস্তবভিত্তিক পদোন্নতি কাঠামো না থাকলে এই পেশার প্রতি আগ্রহ যেমন কমবে, তেমনি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করাও কঠিন হবে।
বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সমন্বয়ক সিনিয়র শিক্ষক মো. আবদুস সালাম খবরওয়ালাকে বলেন বলেন, সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এগুলোর মধ্য হতে বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড ও এন্ট্রিপদ নবম গ্রেড ধরে একটি পদোসোপান তৈরির কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তি সমাধান চায় সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমাজ। শিক্ষকদের দাবি, আদালতের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করে সময়োপযোগী পদোন্নতি বিধি ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হোক।
খবরওয়ালা /এমএজেড