খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ার আকাশ-বাতাস যেন সুরের মূর্ছনায় মাতোয়ারা হয়েছিল এক বসন্তের রাতে। ঘড়ির কাঁটা তখন মধ্যরাত ছুঁইছুঁই, কিন্তু ‘মম ইন’-এর সবুজ চত্বরে তিল ধারণের জায়গা নেই। সেই প্রগাঢ় স্তব্ধতা ভেঙে যখন মঞ্চে উঠলেন উপমহাদেশের সুরসম্রাজ্ঞী রুনা লায়লা, তখন পুরো প্রাঙ্গণ যেন এক জীবন্ত উৎসবের রূপ নিল। তাঁর কণ্ঠে বেজে উঠল কালজয়ী সেই গান—‘সাধের লাউ বানাইলাম বৈরাগী’। ঠিক সেই মুহূর্তেই মঞ্চে ঘটল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। গানের তালে তালে মঞ্চে উঠে এলেন বাংলা চলচ্চিত্রের গানের অমর কণ্ঠশিল্পী খুরশীদ আলম। কিংবদন্তি এই শিল্পীর সাবলীল নৃত্য আর রুনা লায়লার মোহনীয় কণ্ঠ যেন সময়কে থমকে দিয়েছিল। সমবেত শত শত দর্শকের তুমুল করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বগুড়ার রাতের আকাশ। এটি ছিল ‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫’-এর সবচেয়ে স্মরণীয় এবং আবেগঘন মুহূর্ত।
দুই দশক পেরিয়ে আসা এই সম্মাননা অনুষ্ঠানটি এবার আয়োজিত হয়েছে ঢাকার বাইরে, এক বিশাল ক্যানভাসে। উত্তরবঙ্গের সংগীতপ্রেমীদের জন্য এটি ছিল এক পরম প্রাপ্তি। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সমবেত কণ্ঠে ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ এবং ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গান দুটির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর এবং টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম। বক্তারা দেশের সংগীতে শিল্পীদের অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল নবীন ও প্রবীণ শিল্পীদের এক অনন্য মিলনমেলা। রুনা লায়লা মঞ্চের শেষ দিকে এসে শুরুতেই দেশাত্মবোধক গান গেয়ে দেশপ্রেমের এক অনন্য আবহ তৈরি করেন। এরপর তিনি খালি গলায় পরিবেশন করেন তাঁর সাম্প্রতিক জনপ্রিয় গান ‘জ্বালা জ্বালা’, যেখানে তাঁর সাথে কণ্ঠ মেলান হালের জনপ্রিয় শিল্পী ইমরান মাহমুদুল ও কোনাল। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রুনা লায়লা জানান, একদা কলকাতা বিমানবন্দরে তাঁকে এক ভক্ত প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কি সেই সাধের লাউ?’ এই সরল স্মৃতির বয়ান শুনে দর্শকরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
এর আগে সুরের ডালি সাজিয়ে মঞ্চে আসেন সংগীতের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র সাবিনা ইয়াসমীন। ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ গেয়ে তিনি যেমন রোমান্টিক আবহের সৃষ্টি করেন, তেমনি ভাওয়াইয়া গান গেয়ে মাটির টানে দর্শকদের ভাসিয়ে দেন। আধুনিক থেকে লোকজ—সুরের এই বিচিত্র ধারা পুরো অনুষ্ঠানকে দিয়েছিল এক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। রাত ১১টার পর বগুড়ার নিজস্ব তারকা অপু বিশ্বাস ও আদর আজাদের ‘বেহুলা-লখিন্দর’ নৃত্যনাট্যটি ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় মোড়।
এবারের আসরে মোট ১৮টি বিভাগে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য শিল্পী কনকচাঁপাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়া বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হন লোকসংগীতের কিংবদন্তি কাঙ্গালিনী সুফিয়া। পুরস্কারপ্রাপ্তদের সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| বিভাগ | বিজয়ীর নাম | গান/প্রজেক্ট |
| আজীবন সম্মাননা | কনকচাঁপা | সংগীতে সামগ্রিক অবদান |
| বিশেষ সম্মাননা | কাঙ্গালিনী সুফিয়া | লোকসংগীত |
| শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী (আধুনিক) | লিজা | খুব প্রিয় আমার |
| শ্রেষ্ঠ সুরকার (আধুনিক) | বাপ্পা মজুমদার | অবশেষে |
| শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী | সভ্যতা | অধিকার |
| শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী (চলচ্চিত্র) | আতিয়া আনিসা | ছোট্ট সোনা |
| শ্রেষ্ঠ দ্বৈত সংগীত | ইমরান ও সিঁথি সাহা | প্রেম বুঝি |
| শ্রেষ্ঠ নজরুলসংগীত | শহিদ কবির পলাশ | – |
| শ্রেষ্ঠ উচ্চাঙ্গসংগীত | নাশিদ কামাল | – |
| শ্রেষ্ঠ ব্যান্ড | মেট্রিক্যাল | গণতন্ত্রের ঘুড়ি |
| শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানি | বেঙ্গল মিউজিক | – |
অনুষ্ঠানটি ঘিরে বগুড়া শহরজুড়ে ছিল সাজ সাজ রব। বর্ণিল ব্যানার আর ফেস্টুনে ছেয়ে গিয়েছিল রাজপথ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা সংগীতানুরাগীদের পদচারণায় মুখর ছিল ভেন্যু প্রাঙ্গণ। অনুষ্ঠানের সফল সমাপ্তি নিয়ে আয়োজনের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম বলেন, ‘ঢাকার বাইরেও যে আন্তর্জাতিক মানের এমন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব, বগুড়া আজ তা প্রমাণ করে দিল। এটি কেবল একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ছিল একটি শুদ্ধ সংগীতের মহোৎসব।’ নীল হুরেজাহান ও অপু মাহফুজের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা পুরো পাঁচ ঘণ্টার অনুষ্ঠানকে দর্শকদের কাছে আনন্দময় করে রেখেছিল। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের এই আসরটি বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।