খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
মাঠের সবুজ গালিচায় তিনি ট্যাকটিকসের জাদুকর, কিন্তু মাঠের বাইরে তিনি এক সংবেদনশীল মানুষ। ম্যানচেস্টার সিটির মাস্টারমাইন্ড পেপ গার্দিওলা আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি কেবল ফুটবলের কিংবদন্তি নন, বরং মানবতার এক অনন্য কণ্ঠস্বর। ইতিহাদ স্টেডিয়ামের ডাগআউটে ম্যানচেস্টার সিটির ব্যস্ত সূচির মাঝেও তিনি সময় বের করে নিয়েছেন গাজার অসহায় শিশুদের জন্য। ফিলিস্তিনের আর্তমানবতার সেবায় আয়োজিত ‘অ্যাক্ট এক্স প্যালেস্টাইন’ নামক এক চ্যারিটি কনসার্টে যোগ দিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ফুটবল বিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
লন্ডনে অনুষ্ঠিত এই চ্যারিটি অনুষ্ঠানে গার্দিওলা উপস্থিত হয়েছিলেন ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের প্রতীক ‘কেফিয়াহ’ কাঁধে জড়িয়ে। সেখানে তাঁর বক্তব্যে কোনো কৌশল বা জয়-পরাজয়ের সমীকরণ ছিল না; ছিল কেবল হারানো শৈশবের প্রতি গভীর হাহাকার। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া বা মা-বাবা হারানো শিশুদের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই স্প্যানিশ কোচ। তিনি বলেন, “গত দুই বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টিভির পর্দায় যখন দেখি কোনো শিশু আর্তনাদ করে তার মাকে খুঁজছে, অথচ সে জানেও না যে তার মা আর বেঁচে নেই—তখন নিজের ভেতর এক অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভব করি। আমার মনে হয়, আমরা সভ্য সমাজ হিসেবে ওদের একা ফেলে এসেছি, আমরা ওদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।”
গার্দিওলা কেবল সমবেদনাই প্রকাশ করেননি, বরং যুদ্ধের নেপথ্যে থাকা বৈশ্বিক ক্ষমতাধরদের ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তারা আসলে মানবতার শত্রু। তিনি ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন, “ক্ষমতাধররা কাপুরুষের মতো আচরণ করছে। তারা নিরাপদ আশ্রয়ে বসে এসি আর হিটারের আরাম ভোগ করে, আর যুদ্ধের ময়দানে পাঠায় একদল নিরপরাধ মানুষকে আরেক দল নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার জন্য। এটি কেবল কোনো ভূ-খণ্ডের লড়াই নয়, এটি স্রেফ মানবতার প্রশ্ন।”
নিচে পেপ গার্দিওলার এই অবস্থান এবং পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ ও প্রেক্ষাপট | ফলাফল/প্রতিক্রিয়া |
| অ্যাক্ট এক্স প্যালেস্টাইন | গাজার শিশুদের জন্য তহবিল সংগ্রহের চ্যারিটি অনুষ্ঠান। | বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। |
| হলুদ রিবন (Yellow Ribbon) | কাতালান রাজনৈতিক বন্দীদের সমর্থনে পরিধান করেছিলেন। | ইংলিশ এফএ কর্তৃক ২০,০০০ পাউন্ড জরিমানা (২০১৮)। |
| মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি | গাজার মানবিক বিপর্যয় নিয়ে কঠোর বক্তব্য। | এফএ তদন্ত করবে না বলে নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ মিডিয়া। |
| সংবাদ সম্মেলন | টটেনহ্যাম ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে অনুপস্থিতি। | সহকারী কোচ পেপাইন লেইন্ডার্স দায়িত্ব পালন করবেন। |
সাধারণত উয়েফা বা এফএ ফুটবলের মাঠে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বার্তাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে। ইতিপূর্বে নিজ মাতৃভূমি কাতালুনিয়ার রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে সরব হওয়ায় গার্দিওলাকে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়েছিল। তবে ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফের রিপোর্ট অনুযায়ী, এবারের মানবিক বক্তব্যের জন্য তাঁকে কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হবে না। যেহেতু এই বক্তব্যটি ফুটবল মাঠের বাইরে বিদেশের মাটিতে একটি চ্যারিটি অনুষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে, তাই ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) এটিকে তাদের আইনভঙ্গের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে না।
পেপ গার্দিওলার এই নির্ভীক অবস্থান ফিলিস্তিনের নিপীড়িত শিশুদের জন্য এক বড় ধরনের নৈতিক সমর্থন। ক্রীড়াজগতে তারকাদের যখন প্রায়ই বিতর্ক এড়িয়ে চলতে দেখা যায়, সেখানে গার্দিওলা নিজের ক্যারিয়ার বা শাস্তির ভয় তোয়াক্কা না করে মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর এই প্রতিবাদ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের মনে এক বিশেষ মর্যাদার স্থান করে নিয়েছে। এটি আবারও প্রমাণ করে যে, একজন সফল পেশাদার হওয়ার চেয়েও একজন সংবেদনশীল মানুষ হওয়া অনেক বেশি গৌরবের।