খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৭ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রোববার (২৬ এপ্রিল), ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বিরোধী দলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও শহীদদের সংখ্যা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি সংসদ সদস্যদের মাঝে বিরাজমান অস্থিরতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালীন পরিস্থিতি এবং বর্তমান সংসদীয় কাঠামোর তুলনা করেন। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সময় সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও হইচই লক্ষ্য করা যায়।
নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন যে, বিগত ১৮ মাস (জুলাই বিপ্লব পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল) বিরোধী দলগুলো যে ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছিল, বর্তমানে সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়মতান্ত্রিক ধারায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, “গত ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন, সেই আরাম এখন হচ্ছে না। এই কারণে অনেক সমস্যা হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১/১১) উদাহরণ টেনে বলেন, তৎকালীন পরিস্থিতির মতো বিগত ১৮ মাসও একটি বিশেষ রাজনৈতিক আবহে অতিবাহিত হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর মতে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে আজকের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি সমর্থিত সরকার হিসেবে অনেকেই অভিহিত করেছেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিথিলতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জনৈক নেতার বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, তারা একসময় যখন খুশি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন, শয়নকক্ষ কিংবা সচিবালয়ে সচিবদের কক্ষে অবাধে প্রবেশ করতে পারতেন। প্রতিমন্ত্রী বর্তমান সরকারের অধীনে সেই ধরনের ‘অনিয়মতান্ত্রিক’ সুবিধা বন্ধ হওয়ার বিষয়টিকেই বিরোধী দলের বর্তমান অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
জুলাই বিপ্লবের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সংসদে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উপস্থাপনের কঠোর সমালোচনা করেন নৌ প্রতিমন্ত্রী। তিনি সরকারি গেজেট ও বিরোধী দলীয় নেতার দেওয়া তথ্যের মধ্যে গরমিল তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসা প্রধান পয়েন্টগুলো হলো:
সরকারি তথ্য: প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ১,৪০০ এর অধিক শহীদের কথা বলেছিল, যা জাতিসংঘও উল্লেখ করেছে। তবে পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত চূড়ান্ত গেজেটে ৮৪৪ জন শহীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য: প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, গত ১৪ এপ্রিল একটি অনুষ্ঠানে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেছিলেন তিনি ১,৪০০ শহীদের মধ্যে ১,২০০ শহীদের বাসভবন পরিদর্শন করেছেন।
প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্ন: সরকারি গেজেটে সংখ্যা যেখানে ৮৪৪ জন, সেখানে বিরোধী দলীয় নেতা কীভাবে ১,২০০ শহীদের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি প্রকৃত ইতিহাস বিকৃতির আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যে ব্যবসা আমরা গত ৫৪ বছর দেখেছি, আমরা চাই না জুলাইকে কেন্দ্র করে নতুন করে সেই ব্যবসা শুরু হোক।”
প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান শহীদদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নেতৃত্বের ইতিহাস স্বচ্ছভাবে জাতির সামনে তুলে ধরার দাবি জানান। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনীতিবিদদের আহ্বানে যারা আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন, তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা শহীদ ও আহতদের প্রতি অবিচার করার শামিল।
প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সরকারের সমালোচনা ও কার্টুন তৈরির অধিকারকে স্বাগত জানালেও ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি অভিযোগ করেন যে, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর তাঁকে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে অশালীন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি নিয়মতান্ত্রিক ও শালীন সমালোচনার সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান জানান।
নৌ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সংসদে জবাব দেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। প্রতিমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিনি তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
সংখ্যাগত ব্যাখ্যা: ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ সদস্য সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু তাঁর বক্তব্যে জানিয়েছেন যে কেবল জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার অঙ্গ সংগঠনের লোকই শহীদ হয়েছে ১,০০০ এর ওপরে। তিনি সেই তথ্যকেই সমর্থন করেন এবং এখান থেকেই প্রতিমন্ত্রীর কাঙ্ক্ষিত হিসাব পাওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেন।
তথ্যের সত্যতা: বিরোধী দলীয় নেতা দাবি করেন যে, তাঁর দেওয়া কোনো তথ্যই বানোয়াট নয়। তাঁদের কাছে শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল রয়েছে যা ‘চেক এবং ক্রস চেক’ করে নিশ্চিত হওয়ার পর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি প্রতিমন্ত্রীকে সেই তালিকা দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরিশেষে, শহীদদের সংখ্যা এবং বিগত সরকারের সময়কালীন রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে এই বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উভয় পক্ষই জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণের দাবি জানালেও সংখ্যার ব্যবধান এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে অনড় রয়েছে।
সংসদে উপস্থাপিত শহীদ সংখ্যার উপাত্ত:
| উৎস | উল্লেখিত সংখ্যা |
| মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় (গেজেট) | ৮৪৪ জন |
| স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘ (প্রাথমিক) | ১,৪০০+ জন |
| বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি সূত্র | ১,০০০ – ১,৪০০+ জন |