হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার সরসপুর ইউনিয়নের শ্রীধরপুর গ্রামে। মৃত আব্দুর রবের বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তিনি ২০ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নোয়াখালীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আব্দুর রবের ১০ সন্তানকে ঘিরে সম্পত্তির মালিকানা ও বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। পরিবারের কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, বাবার জীবদ্দশায় মেজো ছেলে সালাউদ্দিন ও সেজো ছেলে আলাউদ্দিন কৌশলে তাঁর সব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখিয়ে নেন। এ ঘটনা অন্য ভাইবোনদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁরা নিজেদের প্রাপ্য বুঝে পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
পরিবারের সেই বিরোধই শেষ পর্যন্ত বাবার মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা ও দাফন নিয়ে জটিলতা তৈরি করে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকালে আব্দুর রবের জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হলে ছোট ছেলে সাইদুর রহমান ও তাঁর ছয় বোন এতে বাধা দেন। তাঁদের দাবি ছিল, সম্পত্তির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাবার মরদেহ দাফন করতে দেওয়া হবে না। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মরদেহ দাফনের অপেক্ষায় থাকলেও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের তাৎক্ষণিক সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়।
বিরোধ মেটাতে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস ও বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যক্তিরাও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তবে শুরুতে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় সকাল থেকে চলা আলোচনা সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়।
স্থানীয় মসজিদের সভাপতি মো. সামছুল হক জানান, পরিবারের অন্য সদস্য ও সমাজের লোকজনকে না জানিয়ে আলাউদ্দিন ও সালাউদ্দিন তাঁদের বাবার কাছ থেকে সব সম্পত্তি নিজেদের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ছয় মাস আগে বিষয়টি জানাজানি হয়।
তিনি বলেন, ছোট ছেলে সাইদুর রহমান বাড়িতে বিদ্যুতের মিটার নামানোর কাজে খতিয়ান ও দাগ নম্বরের প্রয়োজন হলে জমির কাগজপত্র ঘেঁটে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর থেকেই ভাইবোনদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে কয়েকবার আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভিযোগের মুখে থাকা দুই ভাই সেখানে উপস্থিত হননি বলে জানান তিনি।
এদিকে, মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থলে যায়। মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমদ জানান, বুধবার সকালে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে শ্রীধরপুর গ্রামে মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ নেয়।
ওসি বলেন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, নেতৃবৃন্দ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। পরে সবার সম্মতিতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জানাজা শেষে আব্দুর রবের মরদেহ দাফন করা হয়।
সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের কারণে একজন মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্য আটকে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনাটি পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে বিরোধের জটিলতা এবং এমন পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর গুরুত্ব সামনে এনেছে।


