নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন সাংবাদিকেরা। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১১টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেস ক্লাবের সামনে রুরাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন (আরজেএফ) জেলা শাখার উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। একই দিন নিহত সাংবাদিকের গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার সুনই এলাকাতেও হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।
জেলা প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন আরজেএফ নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি সুজাদুল ইসলাম। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এরশাদুল হক কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন। ঘণ্টাব্যাপী এ মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সহসভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক এবং দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি শ্যামলেন্দু পাল, আরজেএফের চেয়ারম্যান এস এম জহিরুল ইসলামসহ সাংবাদিক নেতারা।
বক্তারা বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে হত্যার শিকার হতে হবে, অথচ সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় বিচারহীনতা অব্যাহত থাকলে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা যেমন বিঘ্নিত হবে, তেমনি অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে লেখার পরিবেশও সংকুচিত হয়ে পড়বে।
তাঁরা অবিলম্বে সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে সাংবাদিক হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিচার না হওয়ার নজির রয়েছে। এ ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার কার্যকর করা জরুরি।
বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিকেরা সমাজের নানা অসংগতি, অপরাধ ও দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরেন। তাঁদের কাজের কারণে কেউ ক্ষুব্ধ হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কোনো সাংবাদিকের প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা মোকাবিলার আইনসম্মত পথ রয়েছে। কিন্তু গুলি করে হত্যা করার মতো অপরাধের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না। তাঁরা আলিফ হত্যার তদন্তে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
গ্রামের বাড়িতেও বিক্ষোভ, বিচারের দাবি পরিবারের
সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সুনই এলাকাতেও মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। দশধার-পোগলা সড়কের সুনই ফকিরবাড়ি মোড়ে আলিফের পরিবার ও এলাকাবাসীর ব্যানারে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
মানববন্ধনে নিহত সাংবাদিকের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির বলেন, তাঁর ভাই সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন। এসব বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের কারণেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে তাঁর ধারণা।
ভাইকে হারানোর বেদনা প্রকাশ করে শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তো আর আমার ভাইকে কোনো দিন ফিরে পাব না। যারা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ ও সন্দেহের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। তবে আলিফের সীমান্তকেন্দ্রিক প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
১৫ অক্টোবর রাতে গুলিতে নিহত হন আলিফ
পুলিশ ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি পেজ পরিচালনা করতেন আলিফ। ওই পেজে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ, অনিয়ম ও অসংগতির বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন ১৬ অক্টোবর নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত, কী কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে সীমান্ত এলাকার অপরাধসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি
আলিফ হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর সহকর্মী, পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দ্রুত বিচারের দাবি জোরালো হয়েছে। দুটি পৃথক স্থানে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং আদালতের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, অপরাধের খবর অনুসন্ধান এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও সম্পর্কিত। কোনো সাংবাদিক হত্যার শিকার হলে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
আলিফ হত্যার ঘটনায় ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তের অগ্রগতি, হত্যার উদ্দেশ্য এবং অন্য জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন। পরিবারের সদস্য ও সাংবাদিকদের প্রত্যাশা, তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি না করে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।


