খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২৯ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাঁচ বছর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে। তবে এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে কিছু ধর্মভিত্তিক সংগঠন।
২০২০ সালে প্রস্তাব তৈরির পর গত বছর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৫ হাজার ১৬৬ জন শিক্ষক নিয়োগে সম্মতি দেয়—যার মধ্যে সংগীতের জন্য ২ হাজার ৫৮৩ জন এবং শারীরিক শিক্ষার জন্য সমানসংখ্যক শিক্ষক থাকবেন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ২৮ আগস্ট ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫’ জারি করা হয়, যেখানে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে।
কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতারা দাবি তুলেছেন—সংগীত শিক্ষকের বদলে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। তা না হলে তাঁরা আন্দোলনে নামবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক সেমিনারে এসব দলের নেতারা বলেন, শিক্ষার মান অবনতির কারণে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, অথচ সরকার ধর্মশিক্ষার পরিবর্তে গানের শিক্ষক নিয়োগ করছে। সেমিনারে মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম ও মুফতি ইউসুফ সুলতান ছয় দফা প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিটি বিদ্যালয়ে যোগ্য ধর্ম শিক্ষক নিয়োগ, নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করে ধর্ম শিক্ষকের বিধান সংযোজন, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান শিক্ষার্থীদের জন্যও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন বায়তুল মোকাররমে সমাবেশ করে একই দাবি জানায়। পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবৃতির মাধ্যমেও সংগীত শিক্ষক নিয়োগের বিরোধিতা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার ক্লাস প্রতিদিন হলেও নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষক নেই। উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে যাঁরা ধর্ম শিক্ষায় মোটামুটি ভালো, তাঁরা ক্লাসগুলো নেন। ধর্মীয় ক্লাস কার্যকরভাবে নেওয়ার জন্য ধর্ম শিক্ষক নিয়োগ এবং শিশুর মানসিক ও নান্দনিক বিকাশের স্বার্থে সংগীতের শিক্ষক নিয়োগ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, ধর্ম ও সংস্কৃতিচর্চার মধ্যে তো কোনো সংঘাত নেই। একটি বাদ দিয়ে অন্যটি করার বিষয়ও নয়। ধর্মচর্চা শিশুদের চিন্তা ও মননকে নৈতিক ও পরিশীলিত করে। সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার মতো বিষয়গুলো শিশুদের মেধা ও শারীরিক বিকাশ ঘটায়।
‘বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে, নিছক পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। গানসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিশুদের সম্পৃক্ত করতে পারলে তাদের মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ডিভাইসের নেশা থেকেও দূরে রাখা সম্ভব হবে,’ যোগ করেন রাশেদা কে চৌধূরী।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা আরও বলেন, গানের শিক্ষক নিয়োগের গুরুত্ব সরকারকেই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। এই নিয়োগ থেকে সরকার যাতে পিছিয়ে না যায়, সেই সুপারিশও করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তিনি তা বাস্তবায়ন করবেন। আন্দোলন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, সংগীত, চারু ও কারুকলার মতো সৃজনশীল বিষয় শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খবরওয়ালা/এমএজেড