খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৮ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত পরিচয় এক নারী ও এক নবজাতকের গলিত মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক ফলাফলে জানা গেছে, ওই নারীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে মরদেহে পচন ধরায় ধর্ষণের কোনো প্রাথমিক আলামত ময়নাতদন্তে মেলেনি। গত ২০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে মরদেহ দুটি উদ্ধারের পর দীর্ঘ আট দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে সম্পন্ন হওয়া ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আলমগীর হোসেন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, ওই নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে মরদেহে পচন ধরার কারণে ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চিকিৎসকের দেওয়া তথ্যমতে:
নিহতের বয়স: মৃত নারীর বয়স আনুমানিক ৩০ বছর।
শারীরিক অবস্থা: মরদেহ পচে যাওয়ায় আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট) সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
ডিএনএ পরীক্ষা: নিহতদের পরিচয় ও সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।
নবজাতকের বয়স: পুলিশ এবং চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া নবজাতকটির বয়স ছিল মাত্র এক দিন।
ডা. আলমগীর হোসেন আরও উল্লেখ করেন, পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে নবজাতকের বয়স একদিন উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসবের পর সাধারণত ধর্ষণের শারীরিক আলামত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না, বিশেষ করে মরদেহ পচে গেলে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
গত ২০ এপ্রিল সোমবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের গুনটিয়া গ্রামের লৌহজং নদীর তীর থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় মরদেহ দুটি উদ্ধার করে মির্জাপুর থানা পুলিশ। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় মা ও শিশুর গলিত দেহ বের করে আনে। উদ্ধারকালে মরদেহের অবস্থা দেখে ধারণা করা হয়েছিল যে, উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ আগে তাদের হত্যা করে সেখানে পুঁতে রাখা হয়েছিল। পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারায় এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটিকে মির্জাপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ এবং গ্রুপে দাবি করা হয়েছিল যে, ওই নারীকে ধর্ষণের পর পেটের সন্তানসহ হত্যা করা হয়েছে। কোনো কোনো পোস্টে উল্লেখ করা হয়, ধর্ষণের এক পর্যায়ে প্রসব বেদনা শুরু হলে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয় এবং তখন মা ও শিশুকে একত্রে খুন করে বস্তাবন্দি করা হয়।
তবে পুলিশ এই ধরণের তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া অপপ্রচার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “নারী ও নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু অসাধু চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বীভৎস ও মনগড়া তথ্য ছড়িয়েছে। বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে এবং এ ধরণের অপপ্রচার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।”
মরদেহ উদ্ধারের পরদিন স্থানীয় এক গ্রাম পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মির্জাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মির্জাপুর থানার উপপরিদর্শক জাবেদ পারভেজ জানান, হত্যার কারণ নিশ্চিত হওয়া গেলেও হত্যাকারীদের শনাক্ত করা এখনও সম্ভব হয়নি।
তদন্তের বর্তমান পর্যায়: ১. থানায় বার্তা প্রেরণ: ভিকটিমের পরিচয় জানার জন্য দেশের সকল থানায় বেতার বার্তা এবং ছবি পাঠানো হয়েছে। ২. নিখোঁজ তালিকা যাচাই: সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ হওয়া নারীদের তালিকার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া লাশের বর্ণনার মিল খোঁজা হচ্ছে। ৩. ডিএনএ পরীক্ষার অপেক্ষা: ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে নিহতদের পারিবারিক যোগসূত্র শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
ওসি মামুন আরও জানান, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এলে তদন্তে নতুন গতি আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যেতে পারে বলে হাসপাতাল সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই নৃশংস জোড়া খুনের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য বিরাজ করছে এবং স্থানীয়রা দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।