খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে চৈত্র ১৪৩২ | ১১ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ওস্তাদ মুন্সী রইসউদ্দিন—যাঁর সাধনা, সৃষ্টি ও শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে এ দেশের সঙ্গীতভুবন সমৃদ্ধ হয়েছে অপরিমেয়ভাবে।
সঙ্গীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৬ সালে মরনোত্তর একুশে পদক-এ ভূষিত হন—যা তাঁর গৌরবময় জীবনের এক অনন্য স্বীকৃতি।
১৯০১ সালের ১০ জানুয়ারি মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত অথচ আর্থিকভাবে অনটনপূর্ণ পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতো সুরের মাধুর্য, আর সেই সুরেই যেন গড়ে উঠছিল এক ভবিষ্যৎ সাধকের পরিচয়। ফুফাতো ভাই শামসুল হকের হাত ধরে শুরু হয় তাঁর সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানে কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি সঙ্গীতচর্চায় নিজেকে নিমগ্ন করেন। প্রসিদ্ধ সঙ্গীতজ্ঞ রাসবিহারী মল্লিকের কাছে দীর্ঘ ১২ বছর ধ্রুপদ ও খেয়াল শিক্ষার মাধ্যমে তিনি নিজের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেন। পরবর্তীতে গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর সঙ্গীতকলা ভবনে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং লক্ষ্ণৌর শরজিৎ কাঞ্জিলালের কাছ থেকেও সঙ্গীত সাধনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন।
১৯৩৮ সালে কলকাতা বেতারে তাঁর কণ্ঠ প্রথমবারের মতো প্রতিধ্বনিত হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় এসে বেতার শিল্পী হিসেবে যোগ দেন এবং নারায়ণগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্রবেশিকা সঙ্গীত বিদ্যালয়’, যা পরবর্তীতে বহু প্রতিভাবান শিল্পী গড়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৯৫৫ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি সহ-অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৪ সালে অধ্যক্ষের পদ অলঙ্কৃত করেন। তাঁর নেতৃত্বে এ অঞ্চলে সঙ্গীতচর্চা নতুন প্রাণ ফিরে পায়।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রসার, মানুষের মধ্যে সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণে তিনি শুধু শিক্ষাদানই করেননি, বরং সঙ্গীত বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করার পর অসংখ্য পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ—সরল সঙ্গীত, সার-সংগ্রহ, ছোটদের সারেগামা, অভিনব শতরাগ, সঙ্গীত পরিচয়, রাগ লহরী, গীত লহরী—আজও শিক্ষার্থীদের জন্য অমূল্য সম্পদ।
শুধু গ্রন্থ রচনাই নয়, তিনি নতুন নতুন রাগ-রাগিণী সৃষ্টির মাধ্যমেও সঙ্গীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর গবেষণামূলক কাজের জন্য তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কারসহ রাষ্ট্রপতি পুরস্কার ও বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল পিতা। তাঁর সন্তানরাও সঙ্গীতের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন—যা তাঁর উত্তরাধিকারেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী আজ দেশের খ্যাতিমান শিল্পী হিসেবে তাঁরই আদর্শ বহন করে চলেছেন।
১৯৭৩ সালের ১১ এপ্রিল এই মহান সঙ্গীত সাধকের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সুর, তাঁর সাধনা এবং তাঁর সৃষ্টি আজও বেঁচে আছে আমাদের হৃদয়ে, আমাদের সংস্কৃতির গভীরে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি—এক মহৎ সাধক, এক অমর সুরকারের প্রতি।