স্মরণে পান্না কায়সার: এক মহীয়সী নারীর জীবনগাঁথা

পান্না কায়সার—একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাহস, সংস্কৃতি, সাহিত্য আর সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, গবেষক, শিশু সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনীতিবিদ। এক জীবনে বহুমাত্রিক অবদান রেখে তিনি হয়ে উঠেছেন সময়ের প্রগতিশীল চেতনার এক বলিষ্ঠ মুখপাত্র।

সাইফুন্নাহার চৌধুরী নামেও পরিচিত পান্না কায়সার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫০ সালের ২৫ মে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ালেখার সময় তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো বরেণ্য শিক্ষক, যাঁদের প্রভাব পড়েছিল তাঁর চিন্তাজগতে।

১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, উত্তাল গণ-আন্দোলনের মধ্যে, কারফিউ চলাকালে তিনি বিয়ে করেন দেশবরেণ্য সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শহীদুল্লাহ কায়সারকে। কিন্তু সেই সংসার দীর্ঘ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে, পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী আলবদর সদস্যরা তাঁকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফেরেননি।

এই শোকবিদ্ধ জীবনেও থেমে যাননি পান্না কায়সার। একাই মানুষ করেছেন তাঁদের দুই সন্তান—শমী কায়সার ও অমিতাভ কায়সারকে। সন্তানদের লালন-পালনের পাশাপাশি তিনি নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন সংস্কৃতি ও সমাজসেবায়।

১৯৭৩ সাল থেকে তিনি যুক্ত ছিলেন শিশু-কিশোর সংগঠন ‘খেলাঘর’-এর সঙ্গে এবং ১৯৯০ সালে এর প্রধান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি পেয়েছিল নতুন মাত্রা ও গতি।

রাজনীতির ময়দানেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহিত্যচর্চায়ও ছিল তাঁর দীপ্ত উপস্থিতি। ইতিহাস, রাজনীতি, নারীজীবন ও সমাজবোধের বিভিন্ন দিক তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সংবেদনশীলতা আর বাস্তবতাবোধের সঙ্গে। তাঁর লেখালেখিতে যেমন আছে আত্মজৈবনিক বেদনার স্পর্শ, তেমনি আছে আশাবাদ ও অগ্রগতির দিকনির্দেশ। ২০২১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন, যা তাঁর সাহিত্যিক অবদানের এক অনন্য স্বীকৃতি।

তাঁর কন্যা শমী কায়সার আজ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।

২০২৩ সালের ৪ আগস্ট পৃথিবীকে বিদায় জানান অধ্যাপক পান্না কায়সার। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির নয়, এক সময়, এক মূল্যবোধ, এক আদর্শের প্রস্থান।

আজ যখন আমরা তাঁকে স্মরণ করি, তখন স্মরণ করি এক মহীয়সী নারীকে—যিনি ছিলেন প্রজ্ঞার দীপ্তি, প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা ও প্রগতির মূর্ত রূপ। তাঁর জীবনগাঁথা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে চিরকাল।

 

খবরওয়ালা/এসআই

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।