খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, এক অনন্য সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র পরিচালক নন, ছিলেন গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, সম্পাদক, উপস্থাপক এবং অভিনেতা—এক কথায় বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী।
১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চলচ্চিত্রপ্রেমী পরিবারে বেড়ে ওঠা ঋতুপর্ণের পিতা ছিলেন প্রখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা সুনীল ঘোষ। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল।
১৯৯২ সালে শিশুতোষ চলচ্চিত্র হীরের আংটি নির্মাণের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর মাত্র দুই দশকেরও কম সময়ে তিনি বাংলা সিনেমাকে এক নতুন ভাষা, নতুন নন্দনতত্ত্ব এবং নতুন সংবেদনশীলতা উপহার দেন।
১৯৯৪ থেকে ২০১৩—মাত্র ১৯ বছরের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি নির্মাণ করেন ১৯টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর মধ্যে ১২টি চলচ্চিত্র জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিরল অর্জন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে— উনিশে এপ্রিল, দহন, উৎসব, বাড়িওয়ালি, চোখের বালি, শুভ মহরৎ, রেইনকোট, দোসর, সব চরিত্র কাল্পনিক, নৌকাডুবি, সানগ্লাস এবং চিত্রাঙ্গদা।
তাঁর চলচ্চিত্রে মানবসম্পর্ক, নারী-মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক টানাপোড়েন, একাকীত্ব, প্রেম, পরিচয়ের সংকট এবং সমাজের নানা অপ্রকাশিত অনুভূতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কাব্যিক ভাষায় ফুটে উঠেছে। তাঁর গল্প বলার ধরন ছিল এতটাই অনন্য যে প্রতিটি চলচ্চিত্র যেন দর্শকের কাছে এক একটি দৃশ্যমান কবিতায় রূপ নিত।
পরিচালনার পাশাপাশি অভিনেতা হিসেবেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। আরেকটি প্রেমের গল্প, মেমোরিজ ইন মার্চ এবং চিত্রাঙ্গদা-তে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল।
চলচ্চিত্রের বাইরেও তিনি বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জনপ্রিয় বাংলা সাময়িকী আনন্দলোক ও রোববার-এর সম্পাদক হিসেবে তাঁর সৃজনশীল নেতৃত্ব পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল।
বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেন-এর পর যে নতুন ধারার শিল্পভাষা গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম প্রধান নির্মাতা ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।
২০১৩ সালের ৩০ মে, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান না ফেরার দেশে। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নের মধ্যে ছিল ব্যোমকেশ বক্সী।
তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রে সৃষ্টি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। কিন্তু শিল্পীরা কখনও সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যান না; তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। ঋতুপর্ণ ঘোষও তেমনি তাঁর চলচ্চিত্র, চিন্তা ও শিল্পবোধের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে।
“ছয়টি ঋতুই ক্ষণস্থায়ী, নিজের মতো আসে আর যায়—থেকে যায় কেবল একটি ঋতু; হৃদয়জুড়ে মেঘপিয়নের ছদ্মবেশে, যার নাম ঋতুপর্ণ।”
শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা ও সংস্কৃতিসেবী ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রতি।