খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 28শে চৈত্র ১৪৩২ | ১১ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী মিতা হক—যাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর গান পেয়েছিল এক অনন্য মাধুর্য ও গভীরতা। তাঁর গানে ছিল শুদ্ধতা, আবেগ আর সাধনার এক অপূর্ব সম্মিলন।
বাংলাদেশ বেতারের সর্বোচ্চ গ্রেডের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন সঙ্গীতজগতে মর্যাদার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর এককভাবে প্রকাশিত অ্যালবামের সংখ্যা ২৪টি—এর মধ্যে ১৪টি ভারত থেকে এবং ১০টি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত, যা তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ।
১৯৬২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া মিতা হকের সঙ্গীতজীবনের শুরু পরিবার থেকেই। তাঁর চাচা ওয়াহিদুল হক-এর কাছ থেকে তিনি প্রথম গান শেখেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান এবং ড. সনজীদা খাতুন-এর তত্ত্বাবধানে তাঁর সঙ্গীতচর্চা আরও পরিপূর্ণতা লাভ করে।
মাত্র ১১ বছর বয়সে বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিশু উৎসবে অংশগ্রহণ করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম গ্রহণ শুরু করেন, যা তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনাকে গভীরতা ও পরিমার্জিত রূপ দেয়।
শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, একজন সংগঠক ও শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ‘সুরতীর্থ’ নামে একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। পাশাপাশি ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ-এর সহসভাপতি ছিলেন।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৬ সালে শিল্পকলা পদক লাভ করেন। এছাড়াও বাংলা একাডেমি তাঁকে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’-এ সম্মানিত করে, যা তাঁর শিল্পীজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। একই বছরে ‘রবি-চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা’-তেও তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন খ্যাতিমান নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনেতা খালেদ খান-এর সঙ্গে। তাঁদের একমাত্র কন্যা ফারহিন খান জয়িতা।
মিতা হক ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর গান ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। কাঁটাতারের বেড়া তাঁর সুরকে কখনো আটকে রাখতে পারেনি—তিনি ছিলেন দুই বাংলারই প্রিয় কণ্ঠ।
২০২১ সালের ১১ এপ্রিল ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
তবুও তাঁর গান, তাঁর সাধনা, তাঁর উত্তরাধিকার আজও বেঁচে আছে—প্রতিটি রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়ে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি—এক অনন্য কণ্ঠশিল্পী, এক নিবেদিত সাধকের প্রতি।