খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 3শে মাঘ ১৪৩২ | ১৬ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
প্রয়াণ দিবসে
অমর কথাশিল্পী
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ ১৬ জানুয়ারি—বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী, সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস। যাঁর কলমে জীবনের সুখ–দুঃখ, প্রেম–বিরহ, সমাজের নিষ্ঠুরতা ও মানবিকতার চিরন্তন দ্বন্দ্ব এমনভাবে রূপ পেয়েছে, যা আজও পাঠকের হৃদয়ে গভীরভাবে অনুরণিত।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে। তবে তাঁর কৈশোর ও প্রথম যৌবনের বড় একটি সময় কেটেছে ভাগলপুরে, মাতুলালয়ে। এই ভাগলপুরেই তাঁর সাহিত্যসাধনার প্রথম বীজ রোপিত হয়—মানুষ, সমাজ ও জীবনের প্রতি গভীর সহানুভূতির দৃষ্টিভঙ্গি এখানেই গড়ে ওঠে।
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন দেবানন্দপুরের হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুল এবং ভাগলপুরের দুর্গাচরণ এম.ই. স্কুলে। পরবর্তীতে টি.এন. জুবিলি কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একই কলেজে এফ.এ. শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকট তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে দেয়। তবুও এই অসমাপ্ত শিক্ষাই তাঁর সাহিত্যচর্চার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি।
শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়ার পর তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। প্রথমে বনেলি স্টেটে সেটেলমেন্ট অফিসারের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর কলকাতা হাইকোর্টে অনুবাদক এবং বার্মা রেলওয়ের হিসাব দপ্তরে কেরানি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে বাস্তবতার গভীর ভিত্তি।
শরৎচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘বড়দিদি’ ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অচিরেই তিনি হয়ে ওঠেন পাঠকনন্দিত কথাশিল্পী। এরপর একে একে রচনা করেন
বিন্দুর ছেলে, পরিণীতা, বৈকুণ্ঠের উইল, দেবদাস, পল্লীসমাজ, চরিত্রহীন, নিষ্কৃতি, শ্রীকান্ত, দত্তা, গৃহদাহ, দেনা-পাওনা, পথের দাবী, শেষ প্রশ্ন—সহ অসংখ্য গল্প ও উপন্যাস।
এ ছাড়া প্রবন্ধগ্রন্থ ‘নারীর মূল্য’, ‘স্বদেশ ও সাহিত্য’ তাঁর চিন্তাশীল সাহিত্যবোধের সাক্ষ্য বহন করে।
এর মধ্যে শ্রীকান্ত, দেবদাস, চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দেনা-পাওনা ও পথের দাবী অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সম্পদে পরিণত হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁর উপন্যাস ‘পথের দাবী’ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী চেতনার প্রতি সমর্থনের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়—যা তাঁর সাহসী সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রমাণ।
সাহিত্যের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তাঁর অনুরাগ ছিল। তাঁর আঁকা ‘মহাশ্বেতা’ অয়েল পেইন্টিং একটি বিখ্যাত শিল্পকর্ম হিসেবে পরিচিত।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কুন্তলীন পুরস্কার, জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্যপদ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট উপাধি লাভ করেন।
১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি, কলকাতার পার্ক নার্সিং হোমে এই মহান সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে।
মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের আনন্দ–বেদনা, প্রেম–বিরহ, সামাজিক টানাপোড়েন ও মানবিক যন্ত্রণাকে যিনি গভীর সহানুভূতি ও বাস্তবতার আলোয় চিত্রিত করেছেন—আধুনিক কালের সেই প্রিয়তম কথাশিল্পীর প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
অমর থাকুন সাহিত্যে, পাঠকের হৃদয়ে—শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।