এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 17শে চৈত্র ১৪৩২ | ৩১ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে ক’জন সাহসী নারী নির্ভীক কলমে সত্য উচ্চারণ করেছেন, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন তাঁদের অগ্রগণ্য। আপোষহীন মনন, দৃঢ় চেতনা এবং সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার—এই তিনের সম্মিলনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য আলোকবর্তিকা।
১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ ফেনী জেলার ছোট কল্যানপুরে তাঁর জন্ম। শৈশবেই সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়; ষষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই গল্প ও কবিতা লেখার মাধ্যমে তাঁর সৃজনশীলতার সূচনা। অল্প বয়সে বিবাহের কারণে শিক্ষাজীবনে সাময়িক বিরতি এলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে তিনি পুনরায় পড়াশোনায় ফিরে আসেন—যা তাঁর দৃঢ় মানসিকতার উজ্জ্বল প্রমাণ।
পেশাজীবনের শুরু ‘ললনা’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজের মধ্য দিয়ে। ধীরে ধীরে তিনি বুদ্ধিজীবী মহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন এবং মুনীর চৌধুরী ও শহীদুল্লাহ কায়সার-এর মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
১৯৬৯ সালে, প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় তিনি প্রকাশ করেন ‘শিলালিপি’—স্বাধীনতার পক্ষের এক সাহসী পত্রিকা। এই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে তিনি নিজেই দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর কলম হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেন। তাঁর সম্পাদিত ‘শিলালিপি’র একটি সংখ্যার কারণে পাকিস্তানি দোসর আল-বদর বাহিনীর নজরে পড়েন তিনি এবং তাঁদের হত্যা তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর নিজ বাসা থেকে আল-বদর বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে। পরদিন, ১৪ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন—অন্যান্য শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রায়েরবাজার বধ্যভূমি-তে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়—চোখ বাঁধা, পায়ে তখনও শীতের মোজা।
শহীদ সেলিনা পারভীন কেবল একজন সাংবাদিক নন; তিনি ছিলেন সত্য, সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতীক। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার মূল্য কত গভীর, কত বেদনাময়।
স্বাধীনতার সূর্য যতদিন উদ্ভাসিত থাকবে, ততদিন তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং ইতিহাসের পাতায়।
গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক,খবরওয়ালা