খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
রমা চৌধুরী—বাংলার অগ্নিঝরা ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম।
তিনি শুধু একজন নারী নন, তিনি এক জীবন্ত প্রতীক—অমানুষিক নির্যাতনের ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো এক অদম্য মায়ের প্রতিরূপ।
১৯৭১ সালের ১৩ মে ভোরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়ায় নিজ গৃহে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। সম্ভ্রমহানির পরও প্রাণ রক্ষার লড়াইয়ে তিনি পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে রক্ষা করেন নিজেকে। কিন্তু আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাঁর ঘরবাড়ি, জীবনের সব সঞ্চয়, সব আশ্রয়।
এই অসহনীয় বেদনার কাহিনি তিনি লিপিবদ্ধ করেন তাঁর অমর গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’-তে—যা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী নারীজীবনের এক নির্মম দলিল।
শিক্ষাজীবন ও কর্মপথ
১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্ম নেন রমা চৌধুরী।
১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর, ১৯৬২ সালে তিনি কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী ১৬ বছর তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারে জীবন উৎসর্গ করেন।
যুদ্ধের আগুনে জীবন
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রমা চৌধুরী ছিলেন তিন সন্তানের জননী। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিনে ঘরবাড়ি হারিয়ে তিনটি শিশু ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কখনো জলে, কখনো জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে ছিলেন।
বিজয় এলেও তাঁর জীবনে ফিরে এল না শান্তি—বরং এল অন্তহীন ক্ষয়।
বিজয়ের মাত্র কয়েকদিন পর, ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১—মায়ের কোলে নিঃশ্বাস নিতে নিতে মারা যায় তাঁর প্রথম সন্তান সাগর।
দ্বিতীয় সন্তান টগর মারা যায় ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, মায়ের চোখের সামনেই—অসাবধানতাবশত তাঁর হাতেই।
আর তৃতীয় সন্তান টুনু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর—বিজয়ের দিনেই।
তিনটি সন্তান হারিয়ে, রমা চৌধুরী যেন নিজেই বাংলাদেশের মায়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন—যিনি সব হারিয়েও মাথা নত করেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী জীবনসংগ্রাম
স্বাধীনতার পর লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। পত্রিকায় লিখতেন, সম্মানীর বদলে পেতেন কেবল কিছু কপি—সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চালাতেন সংসার।
পরে নিজেই বই লিখে, ছাপিয়ে, ফেরি করে বেড়াতেন পথে পথে।
নিজের লেখা উপন্যাস, প্রবন্ধ ও কবিতা মিলিয়ে তিনি প্রকাশ করেন ১৮টি গ্রন্থ—সবই একা হাতে, এক অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে।
তাঁর বিশ্বাস, তাঁর পথচলা
রমা চৌধুরী ছিলেন নিজ বিশ্বাসে অবিচল। হিন্দু ধর্মীয় প্রথায় আগুনে পোড়ানো নয়—তাঁর তিন সন্তানকেই তিনি সমাহিত করেছিলেন মাটির কোলে।
১৯৭১-এ নির্যাতনের পর টানা চার বছর জুতো ছাড়াই হেঁটেছেন তিনি, শপথ নিয়েছিলেন—এই মাটি, এই দেশ, এই পা—সবই স্বাধীনতার প্রতীক।
তৃতীয় সন্তান হারানোর পর পুনরায় পায়ে জুতো পরা বন্ধ করেন, এবং বাকি ১৫ বছর তিনি খালি পায়ে পথচলা অব্যাহত রাখেন—বাংলার মাটিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে।
জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক, ত্যাগের প্রতিমা।
২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরপারে পাড়ি দেন একাত্তরের এই অগ্নিকন্যা।
তিনি রেখে গেছেন এক অনন্ত বার্তা—
“মানুষ মরেও মরেনা, যদি সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।”
রমা চৌধুরী—
তুমি আমাদের গর্ব,
তুমি আমাদের মাটির বুকের এক চিরন্তন নাম।
তোমার পদচিহ্নে এখনো রক্তজবা ফোটে—
স্বাধীনতার, আত্মত্যাগের, এবং নারীর অদম্য শক্তির প্রতীক হয়ে।