এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 15শে ভাদ্র ১৪৩২ | ৩০ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে কজন তরুণ তাদের জীবন বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতার সূর্যোদয়কে ত্বরান্বিত করেছেন, শহীদ মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ তাঁদের অন্যতম। তিনি শহীদ আজাদ নামেই পরিচিত—এক অমর প্রতীক, এক অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধার নাম।
১৯৪৬ সালের ১১ জুলাই জন্ম নেওয়া আজাদ ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইউনুস আহমেদ চৌধুরী ও মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগমের একমাত্র সন্তান। জন্মের পর থেকেই আদর-স্নেহে বেড়ে ওঠা এই তরুণের শৈশব কেটেছিল নিউ ইস্কাটনের রাজকীয় বাড়িতে। তবে পরিবারের অস্থিরতা, পিতার দ্বিতীয় বিবাহ—সবকিছু ছাপিয়ে মায়ের স্নেহেই বড় হয়ে ওঠেন আজাদ। পরবর্তীতে মা-ছেলে চলে যান ফরাশগঞ্জে।
আজাদ ছিলেন স্বাধীনচেতা, দুরন্ত, সঙ্গীতপ্রেমী, সিনেমাপাগল আর বইপড়ুয়া। পড়াশোনায় খুব মনোযোগী না হলেও তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে ১৯৭০ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও বীরত্ব
ধনী পরিবারের দুলাল হয়েও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। বিলাসের জীবন ছেড়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তির সংগ্রামে। যোগ দেন কিংবদন্তি “ক্র্যাক প্লাটুন”-এ। ঢাকার আকাশ কাঁপানো গেরিলা অভিযানে সাহসের পরিচয় দেন বারবার।
কিন্তু ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট, নিজ বাড়ি থেকে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক হানাদারদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। শারীরিক ও মানসিক সব রকম যন্ত্রণা তাঁকে ভেঙে ফেলতে পারেনি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও একবারও মুখ খোলেননি, সঙ্গীদের নাম প্রকাশ করেননি।
একদিন বন্দি ছেলের সঙ্গে দেখা করতে আসেন মা সাফিয়া বেগম। কেবল ভাত চেয়েছিলেন আজাদ। কিন্তু সেই ভাত তিনি আর ছেলেকে খাওয়াতে পারেননি—হানাদাররা নিয়ে গেছে তার প্রাণপ্রিয় সন্তানকে। আজাদের মৃত্যুর পর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন সাফিয়া বেগম—“আমি আর ভাত খাব না।” এবং সত্যিই, টানা চৌদ্দ বছর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ভাত মুখে তোলেননি।
এই মায়ের বুকফাটা হাহাকার, সন্তানের অমর ত্যাগ আর রক্তমাখা বাস্তবতাকে রূপকথার মতো করে লিখেছেন সাহিত্যিক আনিসুল হক তাঁর অমর উপন্যাস ‘মা’-তে।
আজাদ কেবল একজন শহীদ নন, তিনি বাঙালির স্বাধীনচেতা আত্মার প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—স্বাধীনতার জন্য ভালোবাসার মানুষ, বিলাসের জীবন, এমনকি প্রাণও উৎসর্গ করা যায়।
শ্রদ্ধা, সালাম আর কৃতজ্ঞতা শহীদ আজাদকে।
তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের প্রেরণার শিখা হয়ে চিরকাল দীপ্তি ছড়াবে।
খবরওয়ালা/শরিফ