মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনা শুরু করেছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। বিশেষত তেলের জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার লক্ষ্য নিয়েই ফ্রান্স ও ইতালি তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় লিপ্ত হয়েছে।
ইউরোপীয় উদ্যোগের পটভূমি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিন ইউরোপীয় কর্মকর্তার বরাতে ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, ইতালি ও ফ্রান্স ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেছে। এ পদক্ষেপ গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে না তোলা এবং তেল-গ্যাস রপ্তানি পুনরায় শুরু করা। যদিও বেশিরভাগ শিপিং কোম্পানি পশ্চিমা নৌবাহিনীর নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করছে, ইউরোপীয় দেশগুলো চাইছে সরাসরি ইরানের অনুমতি নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ইতোমধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে ফ্রান্স তার জাহাজকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইডো ক্রোসেটো জানিয়েছেন, এমন পদক্ষেপে বিশেষভাবে যেসব দেশ যুদ্ধে জড়িত নয় তাদের জাহাজকে প্রণালিতে চলাচলের অনুমতি দেওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও প্রতিক্রিয়া
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় ধরে ইরান দ্বারা সীমিত রাখা হয়েছে, যার কারণে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার তেলের দাম এখন ১০০ ডলারের দিকে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।
তুরস্কের পরিবহনমন্ত্রী আব্দুল কাদির উরালোগলু জানিয়েছিলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মালিকানাধীন একটি বাল্ক ক্যারিয়ার প্রণালি পার হয়ে আরব সাগরের দিকে যেতে পারেছে। তবে এটি খুব অল্প সংখ্যক জাহাজের মধ্যে একটি, যা হরমুজ প্রণালির নিরাপদ চলাচল পেয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধের অংশ হতে চায় না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করেছে এবং তেলের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৌশলগতভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতালি, ফ্রান্স ও গ্রিস বর্তমানে ‘অপারেশন অ্যাসপাইডস’ মিশনের অংশ হিসেবে লোহিত সাগরে যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করেছে, তবে হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হয়। প্রণালিতে নিরাপত্তা সীমিত থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।
| বিষয় | বিবরণ | প্রভাব / মন্তব্য |
|---|---|---|
| ইউরোপীয় দেশ | ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস | হরমুজে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত |
| নিরাপত্তা উদ্যোগ | ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা | যুদ্ধ বাড়ায় না, তেল-গ্যাস রপ্তানি নিশ্চিত |
| সাম্প্রতিক কার্যক্রম | তুরস্কের বাল্ক ক্যারিয়ার প্রণালি পার হওয়া | খুব সীমিত জাহাজের চলাচল সম্ভব হয়েছে |
| অর্থনৈতিক প্রভাব | তেলের দাম ৬০ → ১০০ ডলার, গ্যাসের দাম ৭৫% বৃদ্ধি | আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ |
| নৌবাহিনী মোতায়েন | অপারেশন অ্যাসপাইডস | লোহিত সাগরে যুদ্ধ জাহাজ, সরাসরি হরমুজ নিরাপত্তা নেই |
| কৌশলগত গুরুত্ব | বিশ্বের ২০% তেল ও LNG সরবরাহ | হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা জরুরি |
ফ্রান্স ও ইতালি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়ন এখনও অজানা। ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।