খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
২০২৬ সালের আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অংশগ্রহণ না করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি এই বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে মুখ খুলেছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সেই সিদ্ধান্তকে একটি বড় ধরনের ‘ব্লান্ডার’ বা সাংঘাতিক ভুল হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। সাকিবের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে কেবল ক্রিকেটাররাই ক্ষতিগ্রস্ত হননি, বরং দেশের আপামর ক্রিকেট প্রেমীরাও তাদের দলকে বিশ্বমঞ্চে দেখার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
যেকোনো পেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য বিশ্বকাপ খেলা একটি পরম আরাধ্য স্বপ্ন। ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ দল যখন দুর্দান্ত ছন্দে ছিল, ঠিক তখনই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের জেরে এই মেগা ইভেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয় টাইগাররা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়েছিল মূলত আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) থেকে মোস্তাফিজুর রহমানের বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনায় সৃষ্ট অসন্তোষের জল গড়ায় ক্রিকেটীয় কূটনীতি থেকে ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গন পর্যন্ত।
তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সময় দাবি করেছিল যে, দেশের জাতীয় গৌরব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই তারা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই যুক্তি এখন ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আইসিসি এবং ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (বিসিসিআই) সাথে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের জেরে বাংলাদেশ এই আসর বর্জন করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত দেশের ক্রিকেটের জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনে।
দীর্ঘদিন পর এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সাকিব আল হাসান। তিনি মনে করেন, একটি ক্রীড়াবান্ধব জাতির জন্য বিশ্বকাপের মতো মঞ্চ বর্জন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাকিবের ভাষায়:
“এটি আমাদের ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। গোটা দেশের মানুষ তাদের প্রিয় দলকে বিশ্বমঞ্চে লড়তে দেখতে ভালোবাসে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি, এটি ছিল একটি বিশাল শূন্যতা। তৎকালীন সরকারের সেই সিদ্ধান্তটি ছিল একটি সাংঘাতিক ভুল বা ব্লান্ডার।”
সাকিবের এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, মাঠের পারফরম্যান্সে দল ছন্দে থাকা সত্ত্বেও মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তের কারণে ক্রিকেটারদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও বিদ্যমান। তিনি মনে করেন, ক্রিকেটের সাথে রাজনীতি বা কূটনীতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার এবং জাতির আবেগ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা অনুচিত ছিল।
বাংলাদেশ দলের বিশ্বকাপে না যাওয়ার প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি নেতিবাচক বার্তা প্রদান করে। এছাড়া, বিশ্বমঞ্চে দলের অনুপস্থিতি স্পনসরশিপ, ব্রডকাস্টিং রেভিনিউ এবং আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রতিকূল প্রভাব ফেলে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে ক্রীড়া ইভেন্ট বর্জনের এই নজির ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশকে কিছুটা একঘরে করে ফেলেছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
ক্রিকেটারদের মানসিক অবস্থার ওপরও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল ভয়াবহ। দীর্ঘ চার বছর কঠোর পরিশ্রমের পর যখন তারা মূল আসরে খেলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ বর্জনের সিদ্ধান্ত তাদের পেশাদারী মনোবল ভেঙে দেয়। সাকিবের আক্ষেপের সুর সেই সময়কার সামগ্রিক ক্রিকেটীয় পরিস্থিতিরই প্রতিফলন ঘটায়। সমর্থকদের মধ্যে এই নিয়ে এখনও ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে, কারণ একটি দলের ছন্দময় সময়ে এমন বড় মঞ্চে অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য এক ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটি সফলভাবে শেষ হয়ে গেলেও বাংলাদেশের না থাকার আক্ষেপ কাটেনি। তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সেই ভুল সিদ্ধান্তটি এখন ক্রীড়া বিশ্লেষকদের কাছে এক চরম ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে কীভাবে এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা যায় এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।
সাকিবের এই অকপট স্বীকারোক্তি মূলত সেই সময়ের শাসনব্যবস্থার অপরিপক্ব সিদ্ধান্তকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনের ব্যক্তিত্বদের মতে, রাষ্ট্রীয় নীতি ও ক্রিকেটীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারার কারণেই বাংলাদেশকে এমন চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেই ‘বিগ মিস’ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।