বিপ্লবের পর নির্বাচন: পাঁচ দেশের অভিজ্ঞতা

সরকারের কাছে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা—নিরাপদ জীবন, ন্যায্য অর্থনীতি ও মর্যাদাপূর্ণ শাসন। যখন সেই প্রত্যাশা ভঙ্গ হয়, তখন ক্ষোভ জমে ওঠে রাস্তায়। ইতিহাস বলছে, কখনও কখনও সেই ক্ষোভই রূপ নেয় গণ-বিপ্লবে, ক্ষমতাচ্যুত হয় দীর্ঘদিনের শাসক। কিন্তু বিপ্লবের পর নির্বাচন ও নতুন সরকারের হাতে দেশ কেমন পথচলা শুরু করে—তা সব দেশে একরকম নয়। সাম্প্রতিক ও সমসাময়িক ইতিহাসে পাঁচটি দেশের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে।

শ্রীলঙ্কা: অর্থনৈতিক ধস থেকে রাজনৈতিক পুনর্গঠন

২০২২ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে শ্রীলঙ্কা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্যে নেমে আসে, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়। মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশেরও ওপরে পৌঁছে যায়। এর প্রেক্ষিতে ‘আরাগালায়া’ নামে পরিচিত গণআন্দোলনে ফেটে পড়ে জনরোষ। রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশত্যাগে বাধ্য হন।

২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বামপন্থি নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েক জয়ী হন। তাঁর জোট ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার আইনসভায় শক্ত অবস্থান গড়ে। অর্থনৈতিক সংস্কার, আইএমএফ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকারে নতুন সরকার স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে।

তিউনিসিয়া: আরব বসন্তের সূচনা, গণতন্ত্রের টানাপোড়েন

২০১০ সালের ডিসেম্বরে এক ফল বিক্রেতার আত্মাহুতিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় গণঅভ্যুত্থান, যা ইতিহাসে আরব বসন্ত নামে পরিচিত। ২৩ বছরের শাসন শেষে প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবেদিন বিন আলি ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি দেশত্যাগ করেন।

পরবর্তী নির্বাচনে সংবিধান প্রণয়ন পরিষদ গঠিত হলেও রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অভাবে হতাশা বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা গণতান্ত্রিক উত্তরণের গতি শ্লথ করেছে।

মিশর: স্বল্পস্থায়ী গণতন্ত্র, পুনরায় সামরিক প্রভাব

২০১১ সালে মিশর-এ দীর্ঘ ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক-এর পদত্যাগের মাধ্যমে। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন মোহাম্মদ মুরসি

কিন্তু রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালে সেনা-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। ফলে বিপ্লব-উত্তর গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা এক বছরের মধ্যেই থেমে যায়।

ইউক্রেন: কমলা বিপ্লবের দীর্ঘ ছায়া

২০০৪ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইউক্রেন-এ শুরু হয় ‘কমলা বিপ্লব’। রাশিয়া-সমর্থিত প্রার্থী ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ-এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ গড়ে ওঠে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পুনর্নির্বাচনে জয়ী হন ভিক্তর ইউশশেঙ্কো

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপ্লব ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তীব্র করে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও দেশটি বহন করছে।

জর্জিয়া: গোলাপ বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

২০০৩ সালের ‘গোলাপ বিপ্লব’-এ নির্বাচনী জালিয়াতির প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা গোলাপ হাতে পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন। নেতৃত্ব দেন মিখেইল সাকাশভিলি। ২০০৪ সালের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন।

তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর শাসনব্যবস্থা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় চ্যালেঞ্জ থেকেই যায়।

সারসংক্ষেপ

দেশ বিপ্লবের বছর নির্বাচনের ফল পরিণতি
শ্রীলঙ্কা ২০২২ বামপন্থি জোটের বিজয় অর্থনৈতিক সংস্কার প্রচেষ্টা
তিউনিসিয়া ২০১১ সংবিধান পরিষদ নির্বাচন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
মিশর ২০১১ মুরসির জয় ২০১৩ সামরিক অভ্যুত্থান
ইউক্রেন ২০০৪ পুনর্নির্বাচনে ইউশশেঙ্কোর জয় দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন
জর্জিয়া ২০০৩ সাকাশভিলির বিপুল জয় সংস্কার ও বিতর্ক

এই পাঁচ দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়—বিপ্লব ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে, কিন্তু টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি। বিপ্লবের উচ্ছ্বাস যত দ্রুত জন্ম নেয়, স্থায়ী সুশাসন গড়ে তোলা ততটাই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।