খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালার পর দেশের ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। “মৌদ্রিক নীতিবিবৃতি: ব্যাংকের প্রাসঙ্গিকতা” শীর্ষক এই আয়োজনে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও শীর্ষ ব্যাংকাররা অংশ নিয়ে সতর্ক করেছেন—গোপন খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়হীনতা আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ দাবি করেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ও অস্পষ্ট প্রতিবেদন পদ্ধতি প্রয়োজনীয় সংস্কারকে বিলম্বিত করেছে। এর ফলে সম্পদের গুণগত মান অবনতির পাশাপাশি মূলধন পর্যাপ্ততার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে—এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ স্বচ্ছভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং দ্রুত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করাই আস্থা পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত বলে মত দেন তারা।
| সূচক | বর্তমান অনুমান | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|
| প্রকৃত খেলাপি ঋণের অনুপাত | ৩৫.৭% | সম্পদের মানের গুরুতর অবনতি |
| সরকার কর্তৃক ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ | ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি | বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি |
| মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা | ৪–৫% | অর্জন ক্রমশ কঠিন |
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডা. আহসান এইচ. মনসুর আখতার হোসেন বর্তমান মুদ্রা পরিস্থিতিকে “খণ্ডিত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ” বলে আখ্যা দেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ঋণবাজারে বিকৃতি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ মূলধনের অদক্ষ বণ্টন ঘটাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিবেশে সুদের হার বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতারা আকৃষ্ট হতে পারেন, যা ভবিষ্যতে নতুন করে খেলাপি ঋণের ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে।
পাবালী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী সতর্ক করেন, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সীমিত করতে পারে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ও নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শক্তিশালী করপোরেট গ্রাহকেরা তুলনামূলক সুশাসিত প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকছেন, ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।
জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সংস্কার রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সংকটাপন্ন ব্যাংকের জন্য কাঠামোবদ্ধ সমাধান প্রক্রিয়া, সুশাসন মানদণ্ড জোরদার, সম্পদ পুনরুদ্ধার কাঠামো উন্নয়ন এবং দেশীয় বন্ডবাজার সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো ও নগদবিহীন লেনদেন প্রসারকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার মৌদ্রিক নীতিবিবৃতিকে কৌশলগত দিকনির্দেশনা হিসেবে বর্ণনা করেন। কর্মশালার সভাপতি ও মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ এজাজুল ইসলাম উপসংহারে বলেন, টেকসই সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়। সর্বসম্মত মত—স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন জাতীয় অগ্রাধিকার।