কয়েক সপ্তাহের সামরিক প্রস্তুতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে এক নতুন, অনিশ্চিত অধ্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি শুধু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বই দেননি, রাষ্ট্রের আদর্শিক ও কৌশলগত দিকনির্দেশও নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
হামলার জবাবে তেহরান ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তীব্রভাবে অবনতি হয়েছে। হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
গত ডিসেম্বরে অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক দমননীতির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। কঠোর নিরাপত্তা অভিযানে বিক্ষোভ স্তিমিত হলেও ক্ষোভ রয়ে যায়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন থেকে বারবার ইরানিদের উদ্দেশে ‘সাহায্য আসছে’ বার্তা দেওয়া হয়েছিল। খামেনির মৃত্যুর পর ট্রাম্প দাবি করেন, এটি ইরানিদের জন্য “নিজেদের দেশ ফিরে পাওয়ার সুযোগ”। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।
ক্ষমতার কাঠামো: কে নিয়ন্ত্রণে?
বিশ্লেষকদের মতে, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ধাপের হামলার পর থেকেই প্রকৃত ক্ষমতা ক্রমশ সরে যায় সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর–এর হাতে। ফলে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করলেও রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়েনি।
| প্রতিষ্ঠান/পক্ষ | সম্ভাব্য ভূমিকা | বর্তমান অবস্থান |
|---|---|---|
| সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল | নীতিগত ও সামরিক সমন্বয় | কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয় |
| ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর | নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ | শক্তিশালী ও সুসজ্জিত |
| বিরোধী গোষ্ঠী | গণআন্দোলন সংগঠিত করা | নেতৃত্ব ও ঐক্যের ঘাটতি |
বিকল্প নেতৃত্বের অভাব পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করেছে। কেউ কেউ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি–র প্রত্যাবর্তনের কথা বললেও তাঁর পক্ষে দেশে শক্ত ভিত্তি নেই। একইভাবে কুর্দি সশস্ত্র সংগঠন কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি হামলাকে স্বাগত জানালেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ইতিহাসবিদ আরাশ আজিজি সতর্ক করে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এমনকি গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী এই রূপান্তর পর্বই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে—একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ইরান কি সত্যিই ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থে অনুকূল, নাকি একটি দুর্বল ও বিভক্ত ইরানই বেশি সুবিধাজনক?
সব মিলিয়ে, খামেনির মৃত্যু ইরানে তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করলেও টেকসই ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের পথ এখনও অন্ধকারে ঢাকা। বাইরের সামরিক চাপ একটি শাসনব্যবস্থাকে নড়বড়ে করতে পারে, কিন্তু নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা শেষ পর্যন্ত ইরানের জনগণের নিজেদের লড়াইয়ের ওপরই নির্ভর করবে।