খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও রান্নার গ্যাস (এলপিজি) আমদানি ব্যাহত হয়, তবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গত জানুয়ারি থেকে এলপিজির বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দামে গ্রাহককে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। যদিও বর্তমান দাম সামান্য কমেছে, তবে এখনও প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০–৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এলপিজি বাজারকে আবার অস্থিতিশীল করতে পারে।
গত রোববার সচিবালয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন যে, যে কোনো মূল্যে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বাংলাদেশে তৎক্ষণাৎ কোনো জ্বালানি সংকট হবে না।”
বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০–২৭০ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি ১১৫টি কার্গোর মাধ্যমে আনা হয়। এর মধ্যে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসে প্রায় ৪০ লাখ টন এবং বাকি অংশ আসে ওমান ও স্পট বাজার থেকে। বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালে এলএনজি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। মার্চ মাসে মোট ১১টি কার্গো আসার কথা রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি ইতিমধ্যেই নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে।
| এলএনজি সরবরাহ তথ্য | পরিমাণ |
|---|---|
| দৈনিক গ্যাস সরবরাহ | ২৬০–২৭০ কোটি ঘনফুট |
| এলএনজি আমদানি | প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট |
| কাতার থেকে এলএনজি | ৪০ লাখ টন |
| এলএনজি কার্গো সংখ্যা | ১১৫টি |
দেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়। বেসরকারি কোম্পানিগুলো একে নিয়ন্ত্রণ করে। গত নভেম্বরে এলপিজি আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে যাওয়ায় জানুয়ারিতে তীব্র সংকট দেখা দেয়। সরকারি অনুমতি পেয়ে ফেব্রুয়ারিতে এলপিজি আমদানি বেড়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ৯১ হাজার টন এলপিজি এসেছে, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি।
শুল্ক হ্রাস করে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১,৩৪১ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, বাস্তবে বিক্রি হচ্ছে ১,৬০০–১,৮৫০ টাকায়।
দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানি অনুমোদন দিয়েছে। বিপিসির সংরক্ষণ ক্ষমতা ৩৬ দিনের হলেও বর্তমান মজুত ১৫–৩০ দিনের মধ্যে সীমিত। ডিজেল মজুত আছে ১২ দিনের, পেট্রোল ১৯ দিনের, অকটেন ২৯ দিনের, ফার্নেস অয়েল ৯০ দিনের। সমুদ্রপথে আরও ১৫–২০ দিনের তেল আসছে।
জ্বালানি সচিব জানান, চলমান সংঘাত সত্ত্বেও কাতার থেকে বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে বাকি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছাবে। সরকার নিশ্চিত করেছে, ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত থাকবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য অশনিসংকেত। বিশেষ করে তেল, এলএনজি ও এলপিজির দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পেতে পারে।
মোটকথা, সরকার সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে দেশে জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি রয়েছে এবং তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।