খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
দেশের নদ-নদী রক্ষায় বিচারবিভাগীয় কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত ২০টি শিল্প কারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করে নদী দূষণের দায়ে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬), বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে এই আদেশ প্রদান করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে দীর্ঘ শুনানি করেন বিশিষ্ট মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)-এর সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মন্ডল। অন্যদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট মুনতাসির উদ্দিন আহাম্মেদ এবং রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ শফিকুর রহমান।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের ৬ মে শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ রোধে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিল এইচআরপিবি। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত একটি রুল জারি করেছিলেন এবং নদী দূষণকারী কারখানাগুলো চিহ্নিত করতে একটি মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে পরিবেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার একটি আর্থিক খতিয়ান দাখিলেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তর গত ৮ ডিসেম্বর একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। উক্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী অন্তত ২০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের ইটিপি ছাড়াই তাদের ডাইং, টেক্সটাইল ও ওয়াশিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশে পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
নিচে অভিযুক্ত প্রধান শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রদান করা হলো:
| ক্রমিক | প্রতিষ্ঠানের নাম | কার্যক্রমের ধরন | বর্তমান অবস্থা |
| ১ | খালেক টেক্সটাইল | টেক্সটাইল উৎপাদন | ইটিপিবিহীন (অবৈধ) |
| ২ | লীনা পেপার মিল | কাগজ উৎপাদন | নদী দূষণকারী |
| ৩ | আর এস কে ডাইং | ডাইং ও প্রসেসিং | বর্জ্য শোধনাগার নেই |
| ৪ | খান ব্রাদার্স টেক্সটাইল | বস্ত্র শিল্প | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৫ | এসআরএস নিট ডাইং | ডাইং ইউনিট | পরিবেশ ছাড়পত্রহীন |
| ৬ | মেসার্স রুবেল ডাইং | ডাইং সেবা | ইটিপি অনুপস্থিত |
| ৭ | বাংলাদেশ ডাইং অ্যান্ড প্রসেসিং | ডাইং ইন্ডাস্ট্রি | নদী দূষণে অভিযুক্ত |
| ৮ | এশিয়ান ফেব্রিক | ফেব্রিক উৎপাদন | সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ |
| ৯ | জিলানী ডাইং | ডাইং ও ফিনিশিং | ইটিপিবিহীন পরিচালনা |
| ১০ | গাজীপুর বোর্ড মিলস | বোর্ড উৎপাদন | পরিবেশগত আইন লঙ্ঘনকারী |
(তালিকায় অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: নিউ আলম ডাইং, মায়ের দোয়া ডাইং, এম আর ডাইং, আব্দুর রব ডাইং, বিসমিল্লাহ নিট ডাইং, শিমুল ডাইং, রাজ্জাক ওয়াশিং এবং হাজী রাসূল ডাইং।)
হাইকোর্ট এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব দিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে। আদালতের এই নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং গৃহীত পদক্ষেপের একটি ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ বা বাস্তবায়ন প্রতিবেদন আগামী ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের মধ্যে আদালতে জমা দিতে হবে।
পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, শীতলক্ষ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি নদীকে বাঁচাতে হলে শিল্প বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। আদালতের এই আদেশের ফলে একদিকে যেমন নদী দূষণ কমবে, অন্যদিকে অন্যান্য শিল্প মালিকদের জন্য এটি একটি কড়া বার্তা হিসেবে কাজ করবে। আইন অমান্য করে শিল্প পরিচালনা করলে যে চরম মূল্য দিতে হতে পারে, তা এই রায়ের মাধ্যমে সুষ্পষ্ট হয়েছে।