খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
বিশ্বব্যাপী বীমা খাতে জালিয়াতির ধরন অঞ্চলভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রতারণা ক্রমবর্ধমান, আরও বুদ্ধিদীপ্ত এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে দাবিদাররা বিদেশি নথি বা তথ্য ব্যবহার করে বীমা দাবি সমর্থন করেন, যা যাচাই করা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার কিছু দেশে হাসপাতালের নথি সরাসরি দেখতে হয়, কারণ ডিজিটাল বা কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের অভাব রয়েছে। ফলে দূরবর্তী বা দুর্গম অঞ্চলে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায়। প্রতারকরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বীমা দাবি প্রক্রিয়াকে অপব্যবহার করে।
বীমা জালিয়াতির সাধারণ কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে মিথ্যা মৃত্যু বা অসুস্থতার নাটক, অতিরঞ্জিত ক্ষতির দাবি, জাল নথিপত্র তৈরি এবং জীবনবীমার সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতারণা। এসব প্রতারণার ধরন প্রতিটি অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিয়ন্ত্রক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।
পরিবেশগত পরিবর্তন এবং বড় আকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগও বীমা খাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ব্যারেটের মতে, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে অনেক বীমা কোম্পানি কিছু বাজারে পুনর্বীমা নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করছে। ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে, ফলে বীমা ব্যবসা পরিচালনা অনেক ক্ষেত্রেই কম লাভজনক হয়ে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় বীমা কোম্পানিগুলো বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনত্ব ও তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে দাবি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রিমিয়াম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বা কিছু এলাকায় কভারেজ প্রত্যাহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর কুইন্সল্যান্ডে নতুন ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে যখন কয়েকটি কোম্পানি বাজার থেকে সরে গেছে।
মেক্সিকোতেও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাসের কারণে বীমা জালিয়াতির প্রতি সামাজিক সহনশীলতা তুলনামূলক বেশি। দুর্বল আইন প্রয়োগ ও বিচারিক ব্যবস্থার অসঙ্গতির কারণে প্রতারকরা শাস্তি এড়িয়ে যায়, ফলে প্রতারণার সংস্কৃতি শক্তিশালী হচ্ছে। মেক্সিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউশনস-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বীমা জালিয়াতির ৩০ শতাংশই সাজানো সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা স্থানীয়ভাবে ‘মন্টাচোকেস’ নামে পরিচিত।
নিচের টেবিলে বিভিন্ন অঞ্চলে বীমা জালিয়াতির প্রধান কৌশল ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হলো:
| অঞ্চল | প্রধান কৌশল | চ্যালেঞ্জ | প্রভাবিত ক্ষেত্র |
|---|---|---|---|
| আফ্রিকা | জাল নথিপত্র, মিথ্যা স্বাস্থ্য দাবি | ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের অভাব | দূরবর্তী অঞ্চলে যাচাই কঠিন |
| অস্ট্রেলিয়া | প্রাকৃতিক দুর্যোগের অতিরঞ্জিত দাবি | ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা | প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, কভারেজ প্রত্যাহার |
| মেক্সিকো | সাজানো সড়ক দুর্ঘটনা | অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, আইনগত দুর্বলতা | নগদ দাবি, সামাজিক সহনশীলতা বেশি |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বীমা জালিয়াতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থাও আধুনিক করা জরুরি। কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, সন্দেহজনক আচরণ ও নথির অসঙ্গতি দ্রুত শনাক্ত করা, রিয়েল-টাইম ডাটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রেডিকটিভ মডেলিংয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় পক্ষের তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতাও জোরদার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা পিংকার্টন বিভিন্ন দেশে মাঠপর্যায়ে তদন্ত পরিচালনা করে বীমা কোম্পানিগুলোকে ঘটনার প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ে সহায়তা করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক সহযোগিতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুললেই ক্রমবর্ধমান বীমা জালিয়াতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব।
এইভাবে, সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে বীমা খাতে প্রতারণা সীমিত করা সম্ভব, যা গ্রাহক ও শিল্প উভয়ের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।